Date: February 10, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / জাতীয় / আর নয় তারুণ্যশক্তির অপচয় : হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

আর নয় তারুণ্যশক্তির অপচয় : হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

February 04, 2026 07:18:40 PM   অনলাইন ডেস্ক
আর নয় তারুণ্যশক্তির অপচয় : হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

শাহাদৎ হোসেন:
রাজধানীর গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের কেন্দ্রীয় সম্মেলন। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ‘তারুণ্যের শক্তি হোক আল্লাহর বিধানের পক্ষে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে আন্দোলনটির ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো ছাত্র ও তরুণ প্রাণের মিলনমেলা ঘটে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের শীর্ষ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম তারুণ্যের শক্তি ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখান যে, পৃথিবীতে যত বড় বড় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, তার সবগুলোর মূলে ছিল তারুণ্যের তেজ ও আত্মত্যাগ। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে তরুণরাই সামনের সাড়িতে থেকে রাজপথ কাঁপিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “স্টুডেন্টরা আন্দোলন করেছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে, কোটার বিরুদ্ধে। বিগত সরকার অহংকারে অন্ধ হয়ে তাদের দমন করার চেষ্টা করেছে। ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছে, অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে এসেছে, মিডিয়া ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনী জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেছে। ফলে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান হয়েছে এবং সরকার পালিয়ে গেছে। কিন্তু আপনারা এর ভেতরে ঢুকে পড়ে বললেন কী ইসলাম কায়েমের রাস্তা খুলে গেছে! কেন? ইসলামের আদর্শ কি এতই দুর্বল? আল্লাহ কি এতই দুর্বল যে এভাবে চুরির পথে ইসলাম কায়েম করতে হবে? ইসলামকে কেন আপনারা প্রতারণার বস্তু বানাচ্ছেন? -প্রশ্ন রাখেন তিনি।

DJI_20260204134916_0019_D.JPG
রাজনীতিবিদদের বিভ্রান্তিমূলক বয়ানের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “জনগণ না চাইলে আমরা ক্ষমতা চাই না -এমন কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এক শ্রেণির নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে বলে এক কথা, আর ক্ষমতায় যাওয়ার পর বলে অন্য কথা। তারা বলে একদিনে কি সব হয়? ক্ষমতায় যাইয়া লই, তারপর দেখা যাবে।

আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সাথে দয়া করে রাজনীতি করবেন না। সাধারণ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে কিছু রাজনৈতিক ফায়দা হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহ এমন জায়গায় ধরা দেবেন যা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। জনগণের সামনে পরিষ্কার কথা বলুন, কারণ ইসলাম কোনো দুই নম্বরী রাস্তা পছন্দ করে না। আল্লাহর রসুল (সা.) কখনও প্রতারণা বা ছলনার আশ্রয় নেননি।’

তিনি হেযবুত তওহীদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “হেযবুত তওহীদ মাঠ-ঘাটে কৃষক-শ্রমিকের কাছে যে কথা বলে, স্টুডেন্টদের সামনে, সাংবাদিকদের সামনে এবং আন্তর্জাতিক মহলের সামনেও একই কথা বলে। হাশরের দিনেও আমরা এই একই কথা বলব। আমাদের কথা দুই রকম নয়। আমরা চাই আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করতে। যে দীন রসুল (সা.) কায়েম করে শান্তি এনেছিলেন, আমরা সেই দীন চাই। নবী করীম (সা.)-কে মক্কার কাফেররা শাসক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি বলেছিলেন, আমার এক হাতে চাঁদ আর অন্য হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি এই সত্যের পথ ত্যাগ করব না। অথচ আজকের নেতারা যে কোনো প্রকারে একবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া।”

তরুণদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তওহীদের প্রস্তাব দাও, ঈমানের ডাক দাও, কলেমার ডাক দাও। বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আল্লাহর দীন কায়েমের সংগ্রাম করো। এই সংগ্রাম হবে জিহাদের মাধ্যমে। জিহাদ মানে হলো আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা; যেখানে শিরক ও কুফরের সাথে কোনো আপস নেই। টাকা-পয়সার কাছে ঈমান বিক্রি হবে না। দুনিয়ার কোনো স্বার্থের আশা জিহাদে থাকবে না। নির্বাচনের নামে বা আত্মার বিরুদ্ধে জিহাদের যে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “অনেকে জিজ্ঞেস করে আমরা নির্বাচনে যাই না কেন? আমরা এই ভাওতাবাজির নির্বাচনে যাব না। নির্বাচনের আগে অনেকের চেহারা মোবারক দেখা যায় না, কিন্তু ভোট আসলে পোস্টারে সুন্দর হাসি দেখা যায়। দাড়ি, টুপি, পাগড়ি পরে কত দরবেশ সেজে তারা মানুষের সামনে আসে। এদের অনেকে ঋণখেলাপি, অনেকে বিভিন্ন মামলার আসামি। রাজনৈতিক মামলার দোহাই দিয়ে প্রকৃত আসামিদের আড়াল করা হচ্ছে। অনেক প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব, তাদের এক পা ঢাকায় তো অন্য পা লন্ডন বা নিউইয়র্কে। পরিস্থিতি খারাপ দেখলেই তারা চম্পট দেবে। আপনারা মারামারি করবেন আর তারা বিদেশে বসে তামাশা দেখবে। সরকার বলছে নির্বাচন উৎসব হবে। অথচ আমরা দেখছি এটা মারামারি, খুনাখুনি আর শত্রুতার উৎসব। নেতারা একে অপরের চরিত্র হনন করছে, গালাগালি করছে, একে অপরের আইডি হ্যাক করার অভিযোগ তুলছে।”

তিনি বলেন, “এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা তরুণদের আবেগ ও রক্তকে নিজেদের ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। তরুণরা যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে রাজপথে প্রাণ বিসর্জন দেয়, তার সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, অনেক হয়েছে, আর নয়। আর নয় তারুণ্যশক্তির অপচয়। তারুণ্যশক্তিকে আর কারো স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। এখন তরুণদের সামনে একটাই উপায়, তরুণদের শক্তিকে আল্লাহর দীনের পক্ষে, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হবে।”

তিনি মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “তোমরা কি সমৃদ্ধ ছিলে নাকি ফকির ছিলে? তোমরা শাসক ছিলে নাকি গোলাম ছিলে? মেসোপটেমীয়, মিশরীয়, গ্রিক ও রোমান সভ্যতার পর যখন ইসলামি সভ্যতা কায়েম হলো, তখন মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। যখন কোরআন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন আরবরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত রচনা করেছিল। উমাইয়া সালতানাতের সময়ে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রবেশ করেছে। স্পেনে ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনকালে প্রযুক্তিবদ্যা, মহাকাশ বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও খনিবিদ্যার যে উন্নতি হয়েছিল, আজকের পশ্চিমা সভ্যতা সেই বইগুলোর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে। কিন্তু আজ আমাদের সেই ইতিহাস শেখানো হয় না। আজ আমাদের সেই গৌরব হারিয়ে গেছে আমাদের পাপাচারের কারণে।”

ছাত্রদের সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “আগামীকাল থেকে প্রত্যেকটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিপ্লবের মন্ত্র চালু করে দাও। ক্যাম্পাসে এক শ্রেণির উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও মব সন্ত্রাসীরা ওঁত পেতে আছে। তারা তোমাদের ওপর হামলা করবে, মিথ্যা গুজব ছড়াবে। কিন্তু মনে রাখবে, মোমেন কখনও পিছপা হয় না। মোমেন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। হেযবুত তওহীদ গত ৩০ বছরে কোনো অন্যায় করেনি, কোনো আইন ভঙ্গ করেনি। যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে অপরাজনীতি করে, চরিত্র হনন করে, তারা কখনও সত্যবাদী হতে পারে না। তোমরা সাধারণ স্টুডেন্টরা এদের প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হবে না। ক্যাম্পাস কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। অন্যের মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা রক্ষা করা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।”

দেশের অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতি নিয়ে তিনি বলেন, “আজ এক শ্রেণির ইসলামি দল আমেরিকার ওপর ভরসা করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু মোমেনরা ভরসা করে একমাত্র আল্লাহর ওপর। ক্ষমতায় কে যাবে না যাবে তার মালিক আল্লাহ। আজ দিল্লী না ঢাকা এই স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো আধিপত্য মানি না। নির্বাচনের দুই দিন আগে জনগণের অগোচরে আমেরিকার সাথে চুক্তির মানে কী? এই চুক্তির সুবিধা-অসুবিধা পার্লামেন্টে আলোচনা হয়নি, মিডিয়াতে আসেনি। আজ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। ডিমের হালি ৭০ টাকা, চালের কেজি ১৫০ টাকা। সুদী পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কারণে দেশ আজ ঋণের জালে জর্জরিত। প্রতিটি শিশুর মাথায় আজ সোয়া লক্ষ টাকা ঋণের বোঝা। শিক্ষা ও চিকিৎসা আজ সিন্ডিকেটের দখলে। মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসার খরচ মেটাতে না পেরে রাজপথে ভিক্ষা করছে। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া শান্তি আসবে না।”

তিনি বক্তব্যের শেষে বিপ্লবের ডাক দিয়ে বলেন, “সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে ইসলাম। আর তারুণ্যের শক্তিই পারে এই সমাজকে মুক্ত করতে। ভয় পেয়ো না, বিপ্লবের পথে এগিয়ে চলো। তোমরাই গড়বে নতুন সোনালী সকাল।”

এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের সভাপতি রাদ-উল ইসলাম। তিনি বলেন,  “হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরাম কেবল একটি নাম নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক জাগরণের একটি শক্তিশালী মঞ্চ। বিগত ২০২৫ সালে আমাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার পর অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আমরা দেশের ছাত্র ও তরুণ সমাজের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এই পথচলার মূল উদ্দেশ্য হলো তারুণ্যের অদম্য শক্তিকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হীন স্বার্থে ব্যবহৃত হতে না দিয়ে মহান আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধান ও সত্যের পথে নিয়োজিত করা।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের তরুণদের আবেগ আর রক্তকে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার। আমরা এমন এক ছাত্র সমাজ গড়ে তুলতে চাই, যারা হবে সুশৃঙ্খল, সাহসী এবং সত্যের পথে আপসহীন। আমাদের এই লড়াই সমাজে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই। আমি বিশ্বাস করি, হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের প্রতিটি কর্মী আগামী দিনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে এবং আমাদের হাত ধরেই আসবে একটি নতুন সোনালী সকাল।”

সকাল ৯টা থেকেই গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ছাত্র ও তরুণদের ভিড় জমতে শুরু করে। শীতের সকালের স্নিগ্ধতা উপেক্ষা করে ব্যানার, ফেস্টুন আর উৎসবমুক্ত স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার ছাত্র-বন্ধুর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং একে অপরের সাথে কুশল বিনিময়ে সম্মেলনস্থলে এক অভাবনীয় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সময়ের সাথে সাথে তারুণ্যের এই জোয়ার আরও বেগবান হয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই অনুষ্ঠানস্থল জনসমুদ্রে রূপ নেয়।

২০২৫ সালে পুনর্গঠিত হওয়ার পর অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ছাত্র ফোরাম যে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছে, তার এক অনন্য প্রতিফলন দেখা যায় এই সম্মেলনে। পবিত্র কোরআন তেলোয়াত ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী প্রার্থনা সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে তরুণদের চোখেমুখে ঝলকে উঠছিল এক রেনেসাঁর বার্তা, এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন।

হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের সভাপতি রাদ-উল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী, ডাক্তার মাহবুব আলম মাহফুজ, এস এম সামসুল হুদা, হেযবুত তওহীদ শিক্ষক ফোরামের সভাপতি রাশেদুল হাসান, হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের উপদেষ্টা সাইফুর রহমান ও আয়শা সিদ্দিকা প্রমুখ।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী বলেন, ইসলাম একটি উদার নৈতিক জীবন ব্যবস্থা যেখানে ঘরোয়া গণ্ডির বাইরেও নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বিশেষ বিবেচনায় কোটা সিস্টেমের মাধ্যমে নারীদের করুণা করার নীতির বিরোধিতা করে বলেন, মেধা ও যোগ্যতা থাকলে একজন নারী সচিবালয়ের মুখ্য সচিব, সেনাবাহিনীর প্রধান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন- ইসলাম এই সুযোগ নারীকে দিয়েছে।

তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা সাবার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে একজন নারী শাসক অর্থাৎ রানী বিলকিসের প্রজ্ঞা, সাহসিকতা এবং সত্য গ্রহণের উদার মানসিকতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা স্বয়ং আল্লাহ কোরআনে বর্ণনা করেছেন এবং কোথাও একে নাজায়েজ বলেননি। অথচ বর্তমানে সূরা নিসার একটি আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারী নেতৃত্বকে কোরআন পরিপন্থী দাবি করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, কোরআনের ওই আয়াতে পুরুষকে নারীর ওপর ‘কাওয়াম’ বা দায়িত্বশীল করা হয়েছে মূলত পারিবারিক জীবনে ভরণপোষণ ও শৃঙ্খলার তাগিদে, যা কখনোই রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণে বাধা হতে পারে না। এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যা আল্লাহর দেওয়া বিধানের ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে নারীদের পিছিয়ে রাখতে চায়।

রুফায়দাহ পন্নী উল্লেখ করেন, বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর একক কেন্দ্রীয় ইমামতির বিষয়টি ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নারীরা স্বমহিমায় আসীন হতে পারেন। তার মতে, নারীকে কেবল একজন মা বা স্ত্রী হিসেবে নয়, বরং দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক শ্রেণির ধর্ম ব্যবসায়ীদের কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা ঘরের বাইরে কাজ করা বা নেতৃত্বে আসা নারীদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলেন কিংবা তাদের চরিত্র নিয়ে ‘বেশ্যা’র মতো জঘন্য ও অসম্মানজনক অপবাদ দেন, তারা মূলত ইসলামকেই কলঙ্কিত করছেন। তাদের এমন কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা ইসলামের সুমহান ও উদার আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি বলেন, ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নারীদের সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করা চরম লজ্জার বিষয় এবং যারা এমন হীনম্মন্যতা প্রচার করে, তারা কখনোই আল্লাহর প্রকৃত সাহায্য লাভ করতে পারে না। এসব ব্যক্তিদের কারণে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য আজ মানুষের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি।

রুফায়দাহ পন্নী নারী নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের বিভিন্ন প্রতিবাদের ধরন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, উগ্রবাদীদের কুরুচিপূর্ণ কথার প্রতিবাদে কেবল ঝাড়ু মিছিল বা প্রতীকী ঘৃণা প্রদর্শন করে টেকসই সমাধান আসবে না। বরং এদের দেওয়া ভুল ন্যারেটিভ বা মিথ্যা ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ইসলামের দলিলভিত্তিক যৌক্তিক ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ বা পাল্টা বয়ান সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আহ্বান জানান যেন তারা ইসলামের প্রকৃত সত্যকে ধারণ করে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ইসলামের প্রকৃত উদারতা ও সাম্যের কথা জনগণের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারলে এবং নারীরা সঠিক ইসলামের পথে থেকে লড়াই করলে কোনো অপশক্তিই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না।

অনুষ্ঠানে হেযবুত তওহীদের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন সংগঠনের সাংগঠনিক গতিশীলতা এবং তরুণদের শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, তরুণদের আবেগ যদি সঠিক পথে পরিচালিত না হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরাম প্রতিটি তরুণকে একজন সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।

আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ ছাত্র ফোরামের প্রতিটি কর্মীকে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধিদীপ্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সত্যের প্রচার করতে হবে। তারুণ্যের এই বিশাল বাহিনীর মেধা ও শক্তিকে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগানো তাগিদ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে প্রধান অতিথিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মানপত্র পাঠ করেন হেযবুত তওহীদ ছাত্র ফোরামের খুলনা বিভাগীয় সভাপতি জান্নাতুন নাঈম। এরপর ছাত্র ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটি ও বিভাগীয় দায়িত্বশীলগণ প্রধান অতিথির হাতে মানপত্র তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে বিগত বছরের কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের মাধ্যমে তরুণদের কাজের গতিশীলতা তুলে ধরা হয়, যা উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ায়। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে হেযবুত তওহীদ সাংস্কৃতিক বিভাগ ও মাটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক ও জাগরণী গানগুলো অনুষ্ঠানস্থলে এক অন্যরকম ভাবগাম্ভীর্য তৈরি করে। সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথির মাধ্যমে শপথনামা পাঠের মাধ্যমে উপস্থিত তরুণরা আবারও সত্যের পথে অবিচল থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন হেযবুত তওহীদের ছাত্রকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোখলেছুর রহমান সুমন। সঞ্চালনায় ছিলেন জিনাত আক্তার ও মুগিরা বিন মনির।