Date: February 10, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / ঢাকার খাল উদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসন: পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

ঢাকার খাল উদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসন: পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা

January 26, 2026 02:21:43 PM   অনলাইন ডেস্ক
ঢাকার খাল উদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসন: পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা

ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী:
রাজধানী ঢাকা একসময় পরিচিত ছিল খালের শহর হিসেবে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার সাথে সংযুক্ত জালের মতো বিস্তৃত এই খালগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক শ্বাসনালি। এগুলো কেবল পানি নিষ্কাশনই করত না, বরং শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু গত কয়েক দশকের দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক প্রশ্রয় আর চরম অব্যবস্থাপনায় সেই খালগুলোর অধিকাংশ এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। আজকের ঢাকা মানেই সামান্য বৃষ্টিতে স্থবির হয়ে যাওয়া এক নগরী। এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে এখন বড় প্রশ্ন—অন্তর্বর্তী সরকারের পর পরবর্তী নির্বাচিত সরকার কি এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান করতে পারবে?

ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মূলত মানবসৃষ্ট একটি সংকট। অতীতের প্রতিটি সরকারের আমলেই প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়ে খাল দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, মার্কেট কিংবা বস্তি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় একসময় ৫০টিরও বেশি খাল সচল ছিল, যার অধিকাংশই আজ অস্তিত্বহীন বা আবর্জনার ভাগাড়। হাইকোর্টের বারবার নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দখলদাররা ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যার খেসারত দিচ্ছে লাখো সাধারণ নগরবাসী।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগ নগরবাসীর মনে আশার আলো জাগিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছয়টি খালের সংস্কারকাজ উদ্বোধন এবং ১৯টি খালের প্রায় ১২৫ কিলোমিটার নেটওয়ার্ক সচল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বে বাউনিয়া, রূপনগর, বেগুনবাড়ি, মান্ডা ও কালুনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোতে উচ্ছেদ ও খনন অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগের স্থায়িত্ব নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েই গেছে। অতীতে আমরা দেখেছি, উচ্ছেদ অভিযান হয় কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে কয়েক মাস যেতে না যেতেই সেই জায়গা পুনরায় দখল হয়ে যায়।

এখানেই পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। খাল উদ্ধার কার্যক্রমকে কেবল সাময়িক প্রকল্প হিসেবে না দেখে একে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে রূপান্তর করতে হবে। পরবর্তী সরকারের কাছে নগরবাসীর প্রধান প্রত্যাশা হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন। প্রভাবশালী হোক বা নিজ দলের নেতাকর্মী—খাল দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় না দিয়ে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ছোট দখলদার উচ্ছেদ করে বড় ভবন মালিকদের ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খাল সংস্কারের ধারণায় পরিবর্তন আনা জরুরি। খাল মানে কেবল ফুলের টব বা পাড়ে রঙিন টাইলসের ওয়াকওয়ে নয়। খালের মূল কাজ পানি পরিবহন। খালের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত গভীরতা নিশ্চিত করা এবং একটি খালের সাথে অন্য খালের সংযোগ সচল রাখা ছাড়া কেবল সৌন্দর্যবর্ধন করে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে। খালগুলোকে নদীর সাথে যুক্ত করে একটি নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করা। বর্তমানে ঢাকার খাল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও রাজউকসহ একাধিক সংস্থার মধ্যে বিভক্ত। এই বিভাজন দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। পরবর্তী সরকারকে একটি শক্তিশালী ও একক সমন্বয় কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। পাশাপাশি শিল্প বর্জ্য ও গৃহস্থালির ময়লা খালে ফেলা বন্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সবশেষে, জনসচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খাল দখল মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। নাগরিকদের বুঝতে হবে, খালে ময়লা ফেলা মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। পরবর্তী সরকারকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।
ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য মেগাসিটি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে খাল উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকার যে কাজের সূচনা করেছে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যদি কেবল ক্ষমতার মোহে সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট করে, তবে ঢাকার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এটি কেবল একটি নগর সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। পরবর্তী সরকার যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, তবেই ঢাকা ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য; অন্যথায় জলাবদ্ধতার অভিশাপে ঢাকা অচিরেই বসবাসের অযোগ্য এক কংক্রিটের মরুভূমিতে পরিণত হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।