


দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সামাজিক বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনি সীমা ও শর্ত, যা হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আইন, অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নের সাথেও জড়িত। প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ কিনা, বৈধ হলে কোন শর্তে তা করা যাবে—এই প্রশ্নগুলো ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে। কেউ আইনকে ঢাল বানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন, আবার কেউ নারীর প্রতি সম্ভাব্য বৈষম্যের আশঙ্কা তুলে ধরেছেন।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিধান এবং হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পূর্ণাঙ্গ রায়। আইন কীভাবে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেয়, সেই অনুমতির শর্ত কতটা কার্যকর, এবং বাস্তবে নারীর অধিকার কতটা সুরক্ষিত—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আইনের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আইনজীবী ইশরাত জাহান হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিটে তার দাবি ছিল, বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা নারীর সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে। তিনি যুক্তি দেন, ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও সব স্ত্রীর প্রতি সমান সুবিচার নিশ্চিত করার কঠোর শর্ত রয়েছে। বিদ্যমান আইনে সেই সুবিচার কার্যকরভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। সালিশি কাউন্সিল শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টি দেখে; ভরণপোষণ, আর্থিক সক্ষমতা বা প্রথম স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। ফলে নারীরা বৈষম্যের মুখে পড়ছেন।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়, বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন না করে স্ত্রীর সম-অধিকার নিশ্চিত না করেই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়া কেন অবৈধ হবে না। দীর্ঘ শুনানির পর ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুলটি খারিজ করে দেন। ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা বহাল থাকে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, বহুবিবাহ সংক্রান্ত ধারা বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয়। আইনটি নারী বা পুরুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। সালিশি কাউন্সিল একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না এবং অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা নেই। আদালত স্পষ্ট করেছেন, এই ধারা বাংলাদেশের নারীদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে না।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় সালিশি কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। অনুমতি ছাড়া করা বিয়ে আইনগতভাবে নিবন্ধনযোগ্য নয়। দ্বিতীয় বিয়ের জন্য আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদনে দ্বিতীয় বিয়ের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতির বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়। এরপর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রীর প্রতিনিধিকে মনোনয়ন দিতে বলেন। সালিশি কাউন্সিল যদি প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত মনে করে, তখন অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকারী জজ আদালতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে কঠোর আইনগত শাস্তি রয়েছে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্পূর্ণ দেনমোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হয়। টাকা পরিশোধ না করলে তা ভূমি রাজস্বের মতো আদায়যোগ্য। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
তথ্যসূত্র: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১; হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় (বহুবিবাহ সংক্রান্ত রিট)