


শীত মৌসুম শুরু হতেই দেশজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস। আক্রান্ত হলে এই ভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫ জেলাতেই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা এর বিস্তারের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলছে।
দেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে শনাক্ত হওয়া নিপাহ ভাইরাসের চারটি কেসের সবকটিতেই শতভাগ মৃত্যু হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো দেশে একটি ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’ শনাক্ত হয়েছে, যা এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্যাটার্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে আইইডিসিআরের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় উপস্থাপিত এক প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা। তিনি জানান, গত বছর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত চারজনের সবাই মারা গেছেন, যেখানে বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। এখনো নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা আবিষ্কৃত না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত খেজুরের কাঁচা রস পান করার মাধ্যমে মানুষ সাধারণত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এছাড়া দেশীয় নেশাজাতীয় পানীয় ‘তাড়ি’ও নিপাহ সংক্রমণের একটি উৎস হিসেবে চিহ্নিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় এক মায়ের বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা সংক্রমণের নতুন ও বিরল পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা, পেশীতে ব্যথা, ঘুম ঘুম ভাব, বমি, ঝিমুনি ও অচেতনতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মস্তিষ্কে প্রদাহ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
আইইডিসিআরের উপস্থাপিত প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে নওগাঁর ৮ বছর বয়সী এক শিশুর ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আগস্ট মাসে, শীতকাল ছাড়াই তার শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়, যা দেশের প্রথম ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’। ওই শিশুর সংক্রমণের উৎস ছিল বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল—যেমন কালোজাম, খেজুর ও আম—যা নিপাহ সংক্রমণের নতুন ও অ্যালার্মিং মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ এখন শুধু খেজুরের কাঁচা রসে সীমাবদ্ধ নেই। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত যেকোনো আধা-খাওয়া ফল সরাসরি খাওয়ার মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে এবং তা সারা বছরই সম্ভব। এছাড়া মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের হার প্রায় ২৮ শতাংশ, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ২০২৫ সালের অ-মৌসুমি নিপাহ কেস এবং নতুন সংক্রমণ পথ একটি বড় সতর্কবার্তা। নিপাহ এখন আর শুধু শীতকাল বা খেজুরের কাঁচা রসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সারা বছরব্যাপী ও বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিপাহ থেকে রক্ষা পেতে খেজুরের কাঁচা রস সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা জরুরি, কারণ মশারি দিয়ে খেজুর গাছ ঢেকে রাখার পদ্ধতিও শতভাগ নিরাপদ নয়। খেজুরের রসের নিরাপদ বিকল্প হিসেবে খেজুরের গুড় ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং গাছের নিচে পড়ে থাকা বা ফাটা ফল না খাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী সংক্রমণ। যেহেতু এর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর উপায়। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলার মধ্য দিয়েই এই ভয়ংকর ভাইরাস থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।