Date: February 10, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / খেলাধুলা / ফুটবলের জাদুকর সামাদকে ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে প্রজন্ম - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

ফুটবলের জাদুকর সামাদকে ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে প্রজন্ম

February 02, 2026 11:33:53 AM   ক্রীড়া ডেস্ক
ফুটবলের জাদুকর সামাদকে ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে প্রজন্ম

ফুটবল যখন নিছক একটি খেলা নয়, হয়ে ওঠে শিল্প—তখনই জন্ম নেয় কিংবদন্তি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উপমহাদেশের ফুটবল আকাশে এমনই এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা ছিলেন সৈয়দ আবদুস সামাদ। যিনি ইতিহাসে পরিচিত ‘ফুটবলের জাদুকর’ নামে। আজ ২ ফেব্রুয়ারি, এই মহান ফুটবল শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সময়ের স্রোতে তিনি আজ বিস্মৃত প্রায়।


১৮৯৫ সালের ৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ভুরী গ্রামে জন্ম নেওয়া সামাদ ছিলেন জন্মগত প্রতিভার এক অনন্য উদাহরণ। দেশভাগের পর নাড়ির টানে তিনি চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পার্বতীপুরে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই জনপদেই কাটে তাঁর সময়। পার্বতীপুর শুধু তাঁর আশ্রয়স্থল নয়, বরং তাঁর আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল।
ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা ১৯১২ সালে কলকাতা মেইন টাউন ক্লাবে। তবে ১৯৩৩ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেওয়ার পরই সামাদের প্রতিভা পায় পূর্ণ বিকাশ। তাঁর নেতৃত্বে মোহামেডান টানা পাঁচবার আইএফএ শিল্ড ও কলকাতা লীগ জিতে ইতিহাস গড়ে। সে সময় বুট জুতো ছাড়াই তাঁর নৈপুণ্য ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিল শিল্পের পর্যায়ে।


১৯২৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে সামাদের। মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯২৬ সালে তিনি পান অধিনায়কত্বের দায়িত্ব। অধিনায়ক হিসেবে চীন, ইংল্যান্ড, সুমাত্রা ও মালয়সহ নানা দেশে সফর করে উপমহাদেশের ফুটবলকে পরিচিত করে তোলেন বিশ্বমঞ্চে। চীনের বিপক্ষে ৩–০ গোলে পিছিয়ে থেকেও তাঁর চার গোলের নৈপুণ্যে ৪–৩ ব্যবধানে জয় আজও রূপকথার মতো আলোচিত।


সামাদের পায়ের নিখুঁত মাপজোখ নিয়ে রয়েছে কিংবদন্তিতুল্য গল্প। ইন্দোনেশিয়ার জাভায় এক ম্যাচে তাঁর জোরালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে তিনি খেলা থামিয়ে দাবি করেন, গোলপোস্টের উচ্চতা আন্তর্জাতিক মানের নয়। পরিমাপে দেখা যায়, সত্যিই তা চার ইঞ্চি কম ছিল। এই আত্মবিশ্বাস আর জ্যামিতিক নিখুঁততাই তাঁকে এনে দেয় ‘ফুটবল জাদুকর’ উপাধি।
তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ স্কটিশ ফুটবলবোদ্ধারা মন্তব্য করেছিলেন, “সামাদ যদি ইউরোপে জন্মাতেন, তবে তিনি হতেন সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন।” ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা ফুটবলার এলেক হোসিও স্বীকার করেছিলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রথম সারির দলে খেলার যোগ্যতা ছিল সামাদের। সে সময় জমিদারদের আমন্ত্রণে ‘খেপ’ খেলতে গিয়ে সামাদ মজা করে আগে থেকেই জিজ্ঞেস করতেন—“কয়টা গোল দেব?” আর ঠিক শেষ দশ মিনিটে নির্ধারিত গোল করে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন।


১৯৩৬ সালে একটি গুরুতর চোট তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ইতি টানে। এরপর ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান এই কিংবদন্তি। ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ফুটবলের এই চিরসবুজ শিল্পী। তাঁর অবসরের পর বহু ফুটবলপ্রেমী দুঃখে মাঠে যাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন—এমন ঘটনাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।


কিন্তু আজকের আধুনিক ফুটবলের চাকচিক্যের ভিড়ে সামাদের স্মৃতি যেন ক্রমেই ঝাপসা। জাতীয় পর্যায়ে নেই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কোনো আয়োজন, নেই নিয়মিত স্মরণসভা। পার্বতীপুরে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন, সেখানেও আজ আর চোখে পড়ে না তেমন কোনো উদ্যোগ।


এ বিষয়ে পার্বতীপুরের সাবেক ফুটবলার শরিফুল ইসলাম চঞ্চল বলেন, সামাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে এখন আর উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন হয় না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্ম এই কিংবদন্তির নামই জানে না। নাম শুনলে তারা বিস্মিত হয়। তাই সামাদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এখনই বড় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


পার্বতীপুরে রেলওয়ের যে কোয়ার্টারে সামাদ বসবাস করতেন, সেখানে বর্তমানে অন্য কর্মচারীরা থাকেন। স্থানীয়দের দাবি, এই বাড়িটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ এটি ইতিহাসের অংশ। একই মত দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাকিম সরকার। তিনি বলেন, সামাদের নামে থাকা ইনস্টিটিউট সংস্কার করা এবং তাঁর স্মৃতি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


পার্বতীপুর শহরের ইসলামপুরে অবস্থিত সামাদের মাজার নিয়মিত তদারকি ও দর্শনার্থীদের জন্য সুব্যবস্থার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ফুটবলের জাদুকর সামাদকে নতুন করে চিনবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
ফুটবল সামাদের কাছে ছিল কেবল খেলা নয়—ছিল আত্মসম্মান, শৌর্য আর শিল্পের প্রতীক। প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি পারব আমাদের এই ভূমিপুত্রকে ইতিহাসের বিস্মৃতি থেকে ফিরিয়ে আনতে?