


শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালে স্ট্রোকজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁদের জন্য শীতকাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে ত্বকের কাছাকাছি রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয় এবং রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়াই অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার নিউরোসায়েন্স সেন্টারের চিকিৎসকদের মতে, শীতকালে এই প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন স্ট্রোকের ঝুঁকিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শীতকালীন স্ট্রোকের আরেকটি বড় কারণ হলো রক্তের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়া। নিম্ন তাপমাত্রায় রক্ত স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা আঠালো হয়ে যায়, ফলে রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই ধরনের স্ট্রোককে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইসকেমিক স্ট্রোক’ বলা হয়, যা শীতকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি শীতকালে সূর্যের আলো কম পাওয়ার কারণে শরীরে ভিটামিন-ডি-এর ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
এ ছাড়া শীতের কারণে অনেক মানুষের শারীরিক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম কমে যায়। দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে পড়ে এবং ওজন বৃদ্ধি বা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে, যা স্ট্রোকের অন্যতম সহায়ক কারণ। শীতকালে ফ্লু, নিউমোনিয়া কিংবা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রবণতাও বাড়ে। এসব সংক্রমণ শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা রক্তনালির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পরোক্ষভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় চিকিৎসকরা শরীরকে উষ্ণ রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। শীতের সময় বাইরে বের হলে পর্যাপ্ত গরম কাপড়, টুপি ও মাফলার ব্যবহার করা এবং ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখা জরুরি। যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাঁদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডার অজুহাতে শারীরিক কসরত বন্ধ না করে ঘরের ভেতরে হালকা ব্যায়াম করা বা দিনের উষ্ণ সময়ে কিছুটা হাঁটাচলা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও শরীরকে আর্দ্র রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে রক্ত আরও ঘন হয়ে যেতে পারে, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো সতর্কতা অবলম্বন করলে শীতকালেও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।