


সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের পর অনেক মানুষ বাস্তবে কোনো কম্পন না থাকলেও হঠাৎ করে আশপাশে কাঁপুনি অনুভব করছেন। এই অস্বস্তিকর মানসিক ও শারীরিক অনুভূতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “সিসমোফোবিয়া” বা ভূমিকম্প ভীতি। এটি এক ধরনের ক্লিনিক্যাল ফোবিয়া, যেখানে ভূমিকম্প শেষ হয়ে গেলেও মানুষের মনে অযৌক্তিক ভয়, উদ্বেগ এবং কম্পনের অনুভূতি থেকে যায়।
গত ২১ নভেম্বর বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর মাত্র বিশ দিনের মধ্যে অন্তত ছয়টি আফটারশক অনুভূত হয়। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটে আরও দুটি ভূমিকম্প, যার একটি ছিল ৫ দশমিক ৯ মাত্রার। এমন ধারাবাহিক কম্পনের অভিজ্ঞতা মানুষের মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে। অনেকেই সামান্য শব্দ, দরজা নড়াচড়া কিংবা গাড়ি যাওয়ার কম্পনকেও ভূমিকম্প ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা মানসিক ট্রমার বহিঃপ্রকাশ। কোনো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর মানুষের মস্তিষ্কে বিপদের একটি স্থায়ী স্মৃতি তৈরি হয়। ফলে প্রকৃত বিপদ না থাকলেও শরীর ও মন সতর্ক অবস্থায় থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ তানভীর রহমানের ভাষায়, ভূমিকম্পের মতো তীব্র অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের ভয়ের কেন্দ্র ‘অ্যামিগডালা’কে অতিসক্রিয় করে তোলে। এর ফলে সামান্য কম্পন বা শব্দেও শরীর বিপদের সংকেত পায় এবং মানুষের মধ্যে ভবন ধসে পড়া বা মৃত্যুর আতঙ্ক তৈরি হয়।
এখানে শারীরিক কারণও ভূমিকা রাখে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন জানান, কানের ভেতরের এন্ডোলিম্ফ নামের তরলের ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে কম্পনের মতো অনুভূতি পেতে পারে। অর্থাৎ, সব সময় এই অনুভূতি কেবল মানসিক কারণে নয়, শারীরিক কারণেও হতে পারে। এর সঙ্গে মিডিয়ায় ভূমিকম্পের গ্রাফিকাল ও আতঙ্কজনক কভারেজ মানুষের মনে ভয় আরও বাড়িয়ে দেয়, ফলে অনেকেই আতঙ্কের চক্র থেকে বের হতে পারেন না।
তবে আশার কথা হলো, সিসমোফোবিয়া সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য। মনোবিজ্ঞানীরা কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি ও এক্সপোজার থেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে অযৌক্তিক ভয় কমানোর পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি ভূমিকম্প সম্পর্কে বাস্তবধর্মী জ্ঞান, সেফটি কিট প্রস্তুত রাখা এবং নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার কারণে স্থায়ী মানসিক ট্রমা তুলনামূলক কম দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসমোফোবিয়া মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতায় প্রভাব ফেললেও সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা এবং বাস্তবমুখী প্রস্তুতির মাধ্যমে এই ভয় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। নিয়মিত তথ্যভিত্তিক সচেতনতা এবং মানসিক সহায়তাই পারে ভূমিকম্প-পরবর্তী আতঙ্ক থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।