


ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ‘পল্টিবাজি’ সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো করেই অবগত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা আজকে যেটাকে হারাম বলছে, কাল সেটাকেই হালাল বলছে। উভয় অবস্থাতেই তারা কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় একটা যুক্তি তাদের কাজের পক্ষে দাঁড় করাচ্ছে এবং মানুষকে ছয় নয় বুঝিয়ে দিচ্ছে। তাদের এই যে দ্বিচারিতা, তারা এর নাম দিয়েছে হেকমত। হেকমত মানে কি দ্বিচারিতা, যার কথা আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেছেন? তারা বলে থাকে, হেকমত মানে কৌশল। অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার-প্রেম ও যুদ্ধে সবই বৈধ। এটি একটি বহুল প্রচলিত প্রবচন। ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোও রাজনীতির মাঠে এই নীতি অনুসরণ করে থাকে।
পবিত্র কোর’আনের সুরা তওবার ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নাসারা অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলছেন যে, তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের পণ্ডিত ও সাধু-সন্ন্যাসীদেরকে তাদের রব অর্থাৎ প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে প্রতিপালন করেন মহান আল্লাহ। পীর ও আলেম ওলামারা কীভাবে সেই রব হতে পারেন? এর তাৎপর্য রসুলের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর সাহাবিরা। রসুল বলেছিলেন, এর অর্থ খ্রিষ্টানদের সাধু-সন্ন্যাসী ও আলেমরা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল, এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তাকে হারাম বলে ফতোয়া দিত। এভাবেই তারা খ্রিষ্টানদের রব হয়ে বসেছিল।
আল্লাহ পূর্বের কওমের এহেন পথভ্রষ্টতার ঘটনা কোর’আনে কেন অন্তর্ভুক্ত করলেন? এর কারণ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো আমরাও যেন কোনো ধর্মীয় বক্তা বা পীর সাহেবের ফতোয়াকে আল্লাহর হুকুমের উপরে স্থান না দেই। মনে রাখতে হবে, যারা হালালকে হারাম করছেন, হারামকে হালাল করছেন তারা কিন্তু কোর’আন হাদিসের বিভিন্ন কথাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে, মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমেই সেটা করছেন, ধর্মকে পাশ কাটিয়ে করছেন না। এজন্য তারা জাল হাদিস, তাফসির, সলফে সালেহিন, মুজাদ্দিদ, ইমাম, মুরব্বি যে কারো একটা উক্তি সংগ্রহ করে সেটা দিয়ে মানুষকে বিপথগামী করছেন। কিন্তু যা কোর’আনের বিধানকে খারিজ করে, রসুলাল্লাহর সারা জীবনের কর্মপদ্ধতিকে যদি খারিজ করে এমন কোনো কিছু ইসলাম হতে পারে না।
কিছুদিন আগে আমি সাংবাদিকদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। যেসব সাংবাদিক এসেছিলেন তাদের মধ্যে একজন বিএনপি’র একটি পদে আছেন। কিন্তু তার আলোচনা বোঝা গেল তিনি বৃহৎ একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের আকিদায় বিশ্বাসী। তিনি বললেন, এই যুগে যদি রসুলের মতো বিপ্লবের ঘোষণা দিই তাহলে জঙ্গলেও তো লুকিয়ে থাকতে পারবেন না। সেখান থেকে ধরে এনে ফাঁসি দিয়ে দিবে। এজন্য এখন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। সেটা কি? সেটা হলো, আগে আমাদের সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে হবে। তারপর কোর’আনের আইন পাশ করতে হবে। একবার ক্ষমতায় বসতে পারলে, তখনই আমরা নিজেদের যে মূল স্পিরিট সেটা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করব। এটা হচ্ছে হেকমত, যে হেকমতের কথা আল্লাহই কোর’আনে বলেছেন যে, আপনি তাদেরকে আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন হেকমতের সাথে ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করুন সর্বোত্তম পন্থায়। (সুরা নাহল ১২৫)।
এই যে তারা হেকমতের বাংলা করছেন কৌশল অবলম্বন, এটা কিন্তু তাদের বায়াসড অনুবাদ। হেকমত শব্দের সঠিক অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, গভীর জ্ঞানের কথা। লিসানুল আরব, আল মুজামুল ওয়াসিত ইত্যাদি আরবি ভাষার অভিধানে হেকমত শব্দের ছয়টি অর্থ উল্লেখ করা হয়েছ।
১. প্রজ্ঞা (Wisdom): এটি হিকমাহ শব্দের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ও মূল অর্থ। এর দ্বারা গভীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সঠিক বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে জীবনের সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে বোঝায়।
২. জ্ঞান (Knowledge/Learning): সত্য জ্ঞান বা এমন জ্ঞান যা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে না। তাই যে জ্ঞান মানুষকে বিপথে চালিত করে তাকে হিকমাহ বলা যাবে না। হিকমাহ একটি পজিটিভ ধারণা।
৩. বিচক্ষণতা বা দূরদর্শিতা (Sound Judgment/Prudence): কোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
৪. যথার্থতা (Propriety/Rightness): কোনো কথা বা কাজকে সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিক উপায়ে সম্পন্ন করা।
এছাড়াও হেকমত বলতে দর্শন বা ফিলোসফি, গুঢ় তত্ত্ব বা রহস্যকে বুঝিয়ে থাকে। কোনোভাবেই হিকমত বলতে কৌশল বা ছলচাতুরি বোঝায় না।
তাহলে তারা পবিত্র কোর’আনের যে আয়াতটি ব্যবহার করেন নিজেদের ছল-চাতুরিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য, সেটা আসলে অপব্যাখ্যা ও পক্ষপাতদুষ্ট অনুবাদ। আর এই যে আয়াতে বলা হচ্ছে, তোমরা আহ্বান করো প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা ও উত্তম উপদেশের সাথে আর সর্বোত্তম যুক্তি পেশ করো, এটা হচ্ছে ওয়াজের বিষয়, দাওয়াতের বিষয়। ওয়াজ শব্দটিও এখানে আছে, মাওয়ীজাতুল হাসানাহ (উত্তম উপদেশ)। মানুষকে বোঝানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অবলম্বন করার নির্দেশ আল্লাহ দিচ্ছেন। এটা তো দীন প্রতিষ্ঠার আয়াতই নয়। আর এই আয়াতটি নাজিলও হয়েছে মক্কায় থাকতে অর্থাৎ মৌখিক দাওয়াতের যুগে।
কিন্তু জাতীয় রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বা দীন প্রতিষ্ঠা কীভাবে হবে? সেটা কি উত্তম উপদেশ দিয়ে হবে? সর্বোত্তম যুক্তি পেশ করে হবে? প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা দিয়ে হবে? না। রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করতে গেলে শুধু কথা দিয়ে চিড়ে ভিজবে না। এজন্যই আল্লাহ ব্যবস্থা দিয়েছেন জেহাদ ও কেতালের যার অর্থ সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে একটি গণবিপ্লব সৃষ্টি ও সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁর দীন রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর প্রমাণ রসুলাল্লাহর সমগ্র সংগ্রামী জীবন। তিনি এক জীবনে শতাধিক যুদ্ধ অভিযান করেছেন, নিজে অংশ নিয়েছেন ২৭টি যুদ্ধে। রসুলাল্লাহ যদি চাইতেন যেন তেন প্রকারে একবার ক্ষমতায় যেতে আর ক্ষমতায় গিয়ে নিজের মূল স্পিরিটের প্রকাশ ঘটাতে তাহলে মক্কায় থাকতেই তিনি সে পথে হাঁটতে পারতেন। তাঁকে তো কাফের সর্দাররা প্রস্তাবই দিয়েছিল যে, আপনি কি রাজা হতে চান? তাহলে আপনাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দিব। আপনি কি সুন্দরী নারী চান? তাহলে আপনাকে আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারী এনে দিব? আপনি কি ধন-সম্পত্তি চান? আপনাকে আমরা আরবের সবচেয়ে ধনী বানিয়ে দিব। বিনিময়ে আপনি আপনার দাওয়াত বন্ধ করবেন। কিন্তু রসুলাল্লাহ আপসের জন্য এ সকল লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, “আল্লাহর কসম, যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি এ কাজ থেকে বিরত হব না, যতক্ষণ না আল্লাহ্ এর ফায়সালা করেন, হয় এই সত্যের বিজয় হবে, নয়তো মোহাম্মদ ধ্বংস হয়ে যাবে।” এর দুইয়ের মধ্যে আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আমৃত্যু এই কথার উপর অটল থেকে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন এবং জাজিরাতুল আরবে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি শিরক বা কুফরি ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করেননি।
আজকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখি সারাবছর সেক্যুলার দলগুলোকে গালি দিতে, কিন্তু নির্বাচন আসলেই তারা সেসব সেক্যুলার দলগুলোর সঙ্গে আপসরফা করে আসন-ভাগাভাগি নিয়ে দর কষাকষি আরম্ভ করে। প্রয়োজনে তারা বামপন্থী দলের সঙ্গেও জোট গঠন করেন। একে তারা বলেন নির্বাচনকালীন ঐকমত্য। কিন্তু আল্লাহর রসুল কি কোনোদিন আবু জাহেল আবু সুফিয়ানের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করেছেন? তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছেন। সব সময় দুটো পক্ষ সুস্পষ্টভাবে আলাদা ছিল- মো’মেন এবং কাফের। হোদায়বিয়ার সন্ধিও রসুল করেছেন কাফেরদের সঙ্গে। সেই হোদায়বিয়ার সন্ধির উদাহরণ দিয়ে আমাদের দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সেক্যুলার দলগুলোর সঙ্গে জোটগঠন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রসুলাল্লাহ তো হোদায়বিয়ার সন্ধি করেছিলেন কাফেরদের সঙ্গে। আমাদের ধর্মভিত্তিক দলগুলো তো এটা বলছে না যে আওয়ামী লীগ কাফের বা বিএনপি কাফের। অর্থাৎ তারা হোদায়বিয়ার উদাহরণ দিলেও এখানে দুই পক্ষই মুসলমান দাবিদার। তাহলে এই উদাহরণ কি খাটে? একইভাবে তারা হেকমতের দোহাই দিয়ে সুদভিত্তিক পুঁজিবাদকে, ব্যাংকিং সিস্টেমকে জায়েজ করে দেয়, একইভাবে তারা নিজেদেরকে কখনও গণতান্ত্রিক দল হিসাবে নিজেদের পরিচয় দেয়, কখনও ইসলামিক দল হিসাবে পরিচয় দেয়, কখনও তওহীদী জনতার সেজে দলীয় পরিচয় গোপন করে গুজব রটিয়ে মবের সৃষ্টি করে আর সেটাকে জেহাদ বলে চালিয়ে দেয়। কখনও তারা বলে নারী নেতৃত্ব হারাম আবার কখনও নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়েই সংসদে যায়। এভাবে চাতুর্যপূর্ণ কলাকৌশল, ছলচাতুরি, গুপ্ত পরিচয় নিয়ে কায়দা করে ক্ষমতা দখল করার কূটবুদ্ধির নাম তারা দিয়েছে হেকমত।
পাশ্চাত্যের তৈরি পদ্ধতি অর্থাৎ শেরক ও কুফরের সঙ্গে আপসকে জায়েজ করার চেষ্টায় তারা ইহুদি ও মোশরেকদের সঙ্গে করা মদীনা সনদের ঘটনাকে যুক্তি হিসাবে হাজির করেন। যে গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব আল্লাহ নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের, সেই গণতন্ত্রকে স্বীকার করে নিয়ে সেই পদ্ধতিতে রাজনীতি করে, মিটিং, মিছিল, শ্লোগান দিয়ে এবং সেই পদ্ধতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজেদের কাজকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টায় এরা এমন অন্ধ হয়েছেন যে, আপোস ও চুক্তির মধ্যে বিরাট তফাৎ দেখতে পান না। আকীদা বিকৃতির জন্য এরা বিশ্বনবীর (দ.) ইহুদী ও মোশরেকদের সঙ্গে চুক্তিকে তাদের নিজেদের শেরক ও কুফরের সাথে আপোষের সঙ্গে একই পর্যায়ে ফেলেছেন। আপস হল কিছু দেয়া কিছু নেয়া, বিরুদ্ধ পক্ষের কিছু দাবী মেনে নেয়া ও নিজেদের কিছু দাবী বিরুদ্ধ পক্ষকে মেনে নেয়ানো। মদীনার চুক্তিতে বিশ্বনবী (দ.) বিরুদ্ধ পক্ষের অর্থাৎ ইহুদী ও মোশরেকদের সিস্টেমের একটি ক্ষুদ্রতম কিছুও মেনে নেন নি, ইসলামের জীবন-ব্যবস্থার, দীনের সামান্য কিছুও তাদের উপর চাপান নি। কারণ তিনি আপস করছিলেন না। তিনি মদীনা রক্ষার জন্য শুধু একটি নিরাপত্তা চুক্তি (Security Treaty) করছিলেন। চুক্তিটির প্রধান কয়েকটি শর্ত উল্লেখ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমন- (ক) মদীনা শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে ইহুদী ও মোশরেকরা মুসলিমদের সঙ্গে একত্র হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। (খ) যুদ্ধে ইহুদী ও মোশরেকরা তাদের নিজেদের খরচ বহন করবে, মুসলিমরা নিজেদের খরচ বহন করবে, যত দিনই যুদ্ধ চলুক। (গ) ইহুদী ও তাদের সমগোত্রের লোকজন রসুলাল্লাহর (দ.) অনুমতি ছাড়া কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না। (ঘ) এই চুক্তির অধীন সমস্ত গোত্রগুলির মধ্যে যে কোন প্রকার বিরোধ বা গণ্ডগোল যাই হোক না কেন সমস্ত বিচার মহানবীর (দ.) কাছে হতে হবে।
চুক্তির ঐ প্রধান প্রধান বিষয়গুলির দিকে মাত্র একবার নজর দিলেই এ কথায় কারো দ্বিমত থাকতে পারে না যে, বিন্দুমাত্র ত্যাগ স্বীকার না করেও মহানবী (দ.) এমন একটি চুক্তিতে ইহুদী ও মোশরেকদের আবদ্ধ করলেন- যে চুক্তির ফলে তিনি মদীনার ইহুদী ও মোশরেকদের নেতায় পরিণত হলেন। এটা ছিল একাধারে একটি রাজনৈতিক, কুটনৈতিক ও সামরিক বিজয়। যারা ‘হেকমতের’ দোহাই দিয়ে ইসলামী বিপ্লবের পথ ‘জেহাদ’ ত্যাগ করে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক পদ্ধতি গ্রহণ করে মিটিং, মিছিল, শ্লোগান দিয়ে, মানুষের সার্বভৌমত্বের সংগঠনের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, কিন্তু বিনিময়ে অপর পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র প্রতিদান বা ত্যাগস্বীকার পান নি, তারা কেমন করে তাদের ঐ শেরক ও কুফরের কাজকে বিশ্বনবীর (দ.) ঐ মহা বিজয়ের সঙ্গে একই পর্যায়ে ফেলে তাকে ছোট করেন তা বোঝা সত্যিই মুশকিল। এ সবই হচ্ছে হেকমতের কারসাজি।
এখন প্রশ্ন হলো, সত্যিকারের হেকমত আসলে কোনটি? সেটা হচ্ছে, আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি। আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া সিস্টেম অবলম্বনের পদ্ধতিকে হেকমত বলে না, সেটা হলো শেরক ও কুফরি পদ্ধতি। আল্লাহ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আদেশ দিয়েছেন। এখন কীভাবে সেই যুদ্ধটি আপনি করবেন, কীভাবে নিজের বাহিনীকে প্রস্তুত করবেন, কীভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করবেন, অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করবেন এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে, প্রজ্ঞাপূর্ণভাবে, দূরদৃষ্টির সঙ্গে করাই হচ্ছে হেকমত। এগুলো নির্ভর করবে উদ্ভূত পরিস্থিতির উপর। সেখানে কোর’আনের আয়াতে আপনি পাবেন না। আপনার হেকমত সেখানে ব্যবহার করবেন। আল্লাহ তাঁর নবীকে এই হেকমত দান করেছিলেন যার দ্বারা তিনি নিখুঁত কর্মপরিকল্পনা করতে পারতেন। কেবল নবী নয়, আল্লাহ যাঁকে ইচ্ছা হিকমত দান করতে পারেন, এ কথা তিনি পবিত্র কোর’আনেই উল্লেখ করেছেন (সুরা বাকারা ২৬৯)।
তাহলে শেষ কথা হলো, আল্লাহর হুকুমকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করার যে জ্ঞান, তাকে বলে হেকমত। যেমন মানুষ খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এখন এই মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করবেন, সে বিষয়ে কিন্তু কোর’আনের কোনো নির্দেশ নেই। এই যুগে তলোয়ার দিয়ে শিরোচ্ছ্বেদের পরিবর্তে আপনি অন্য কোনো পদ্ধতি নিতে পারেন। কিন্তু দণ্ডবিধি যেটা আল্লাহ দিয়েছেন সেটা আপনি পরিবর্তন করতে পারেন না। এই পদ্ধতি নির্বাচন করা হচ্ছে আপনার হেকমত, আর দণ্ডবিধি মেনে নেওয়া হচ্ছে তওহীদ। হেকমতের দোহাই দিয়ে পশ্চিমা জীবনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া, সেই ব্যবস্থার সংবিধানের অধীনে শপথ নেওয়ার অর্থ তওহীদকেই অস্বীকার করে সরাসরি কাফের ও মোশরেক হয়ে যাওয়া।
লেখক: লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট।