


বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এক ভয়াবহ অশান্তি ও অস্থিরতার চিত্র দেখতে পাই। দেশে দেশে যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত আর ত্রাহি সুরের হাহাকার। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানদের ওপর যে সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়ন চলছে, তা ইতিহাসের সব নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। ফিলিস্তিনে লক্ষ লক্ষ নিরীহ নারী-শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে লাখ লাখ মানুষ আজ উদ্বাস্তু। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারেও একই চিত্র। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানে যে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তা আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে।
বিশ্বজুড়ে আজ প্রায় ২৪০ কোটি মুসলমান। এটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ। আমাদের রয়েছে ৫৭টি স্বাধীন রাষ্ট্র, কোটি কোটি বর্গমাইলের বিশাল ভূখণ্ড এবং অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। তা সত্ত্বেও আজ সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত, নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে এই মুসলিম জাতিই। কেন এমন হচ্ছে? আমাদের ঘরে ঘরে পবিত্র কোর’আন রয়েছে, লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসায় প্রতিদিন ইবাদত বন্দেগি হচ্ছে, আমরা বিশাল এক জনশক্তি- তবুও আমরা কেন এত অসহায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং আমাদের জাতীয় ও বৈশ্বিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের বর্তমান অবস্থার একটি চমৎকার কিন্তু মর্মান্তিক তুলনা হতে পারে প্রাণহীন একটি দেহের সঙ্গে। একজন মানুষের হাত, পা, চোখ, কান সবই থাকতে পারে, কিন্তু তার ভেতরে যদি প্রাণ বা আত্মা না থাকে, তবে তাকে আমরা জীবন্ত মানুষ বলতে পারি না; সে একটি মৃতদেহ। ঠিক তেমনি মাথার ওপরে ফ্যান থাকতে পারে, তার ব্লেড বা মোটর সবই থাকতে পারে, কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলে তা থেকে বাতাস পাওয়া যায় না। বর্তমান মুসলিম সমাজ এবং বিশ্বমানবতার অবস্থাও ঠিক এমনই।
আমাদের নামাজ আছে, রোজা আছে, হজ আছে, যাকাত আছে। পবিত্র কোর’আনের তেলাওয়াত চলছে ঘরে ঘরে। কিন্তু আমাদের ভেতরে সেই আসল জিনিসটি নেই। আমরা তওহীদ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছি। আমরা ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানগুলো ঠিকই পালন করছি, কিন্তু ধর্মের যে মূল উদ্দেশ্য- মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা- তা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে সরে গেছি।
তসবির দানার একটি সহজ উদাহরণ থেকে আমরা আমাদের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা খুব সহজেই বুঝতে পারি। একটি তসবির ১০০টি দানাকে এক সুতোয় গেঁথে রাখা হয়। সুতোটি কেটে দিলে দানাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ঠিক তেমনি, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ রাখার সেই মূল সুতোটি হলো তওহীদ- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। কিন্তু আজ আমরা সেই মূল বিশ্বাস থেকে দূরে সরে গিয়ে হাজারও দল, মত, ফেরকা আর রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না।
আমরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করছি। মধ্যপ্রাচ্যে যদি মুসলিম দেশগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হতো, তবে কোনো পরাশক্তির সাধ্য ছিল না সেখানে আগ্রাসন চালানোর। আমাদের এই বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। তারা আমাদের সম্পদ লুট করছে, আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করছে, আমাদেরকে নিজেদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে। এটি শুধু বৈশ্বিক পর্যায়ে নয়, আমাদের জাতীয় পর্যায়েও শতভাগ সত্যি। আমরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। সরকারি দল, বিরোধী দল ইত্যাদি নানা পরিচয়ে আমরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। একসাথে মিলে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। এর ফলে অর্থাৎ এ বিভক্তি ও হানাহানির ফলে আমরা জাতিগতভাবে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
সচেতন নাগরিকমাত্রই আমার কথায় একমত হবেন যে, বাংলাদেশ আজ বিশ্ব রাজনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্রে (ঈবহঃবৎ ড়ভ এৎধারঃু) পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তি, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারত, সবারই নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। তাদের কাছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই; তাদের প্রয়োজন আমাদের ভূমি, আমাদের সমুদ্রবন্দর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ।
তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলকে ব্যবহার করতে চায়। আর এর ফাঁকে আমরা হারাচ্ছি আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। আজ আমাদের ঘাড়ে ১১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক ঋণের বোঝা। সুদভিত্তিক অর্থনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমরা ধীরে ধীরে এক পঙ্গু ও পরনির্ভরশীল জাতিতে পরিণত হচ্ছি। আমাদের দেশের তরুণেরা বেকারত্বের জ্বালায় দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠছে, লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন দিচ্ছে। দেশে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
এসবের আড়ালে আমাদের দেশে চলছে অপরাজনীতি আর দুর্নীতির মহোৎসব। সম্পদের পাহাড় গড়ছে গুটিকয়েক মানুষ, আর কোটি কোটি সাধারণ মানুষ ভাতের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো হলেও এই প্রচলিত ব্যবস্থা কার্যতভাবে সাধারণ মানুষের মুক্তি আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
একইভাবে আমাদের বিচারব্যবস্থাতেও ত্রুটি রয়েছে। লাখ লাখ মামলা আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে আছে। মানুষ বিচার পাচ্ছে না বলে হতাশ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। সমাজে খুন, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির মতো অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করেছে। এর মূল কারণ হলো, আমরা মানুষের তৈরি এমন এক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছি, যা সাধারণ মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা মেটাতে ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অক্ষম। সর্বশক্তিমান স্রষ্টা যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন মানুষের জন্য কোন বিধান কল্যাণকর। অথচ আমরা সেই আল্লাহর দেয়া বিধানকে বাদ দিয়ে মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ আইনের ওপর ভরসা করছি।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে আমাদের সামনে মুক্তির উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে। আমাদের প্রথম পরিচয়, আমরা এক স্রষ্টার সৃষ্টি। আমাদের পিতা আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.)। আমরা সকলে এক মানবজাতির অংশ। তাই আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেই মহান স্রষ্টার বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
তওহীদ বা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রকৃত অর্থ কেবল মুখে উচ্চারণ করা নয়। এর অর্থ হলো একটি দৃঢ় শপথ, ম্রষ্টার বিধান ছাড়া আর কারও তৈরি করা বৈষম্যমূলক ও শোষণমূলক বিধান আমরা মানব না। আমরা যদি সত্যিই স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই, তবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি পরিবর্তন করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন একটি ‘তাওহীদ ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা’, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে স্রষ্টার দেয়া ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে। এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত হবে একটি সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা। যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থনীতিকে সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। পাশাপাশি, বিচার বিভাগকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যেখানে স্রষ্টা প্রেরিত আইনের আলোকে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয়।
অতএব আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, আজ আমাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। যেকোনো মুহূর্তে আমরা ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হারাতে পারি। এমন পরিস্থিতিতে বিভেদের রাজনীতি পরিহার করে আমাদের একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে পৌঁছাতে হবে।
যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, কেবল বাহ্যিক সংস্কার দিয়ে এই ঘুণে ধরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত ও আদর্শিক পরিবর্তন। ব্রিটিশদের তৈরি করা শোষণমূলক ব্যবস্থা দিয়ে আমরা আর চলব না। বিগত দশকগুলোতে আমরা দেখেছি, সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ, যে ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভিত্তিটাই ত্রুটিপূর্ণ।
তাই আজ সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। সাধারণ জনগণ, তরুণ সমাজ, আলেম-ওলামা, বুদ্ধিজীবী- সকলকে আজ ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। আমাদের এক আওয়াজে দাবি তুলতে হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও সুদমুক্ত সমাজের। আমরা যদি স্রষ্টার দেখানো ন্যায়ের পথে ফিরে যাই, তবেই কেবল আমরা এই দুনিয়ায় শান্তি পাব এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যেতে পারব। অন্যথায়, পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি হয়ে নিজেদের পতন আমাদের নিজেদের চোখেই দেখতে হবে।
পরিশেষে একটি কথাই বলা যায়, মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো শান্তি ও নিরাপত্তা। আর এই শান্তি কখনোই মানুষের তৈরি করা বৈষম্যমূলক, স্বার্থান্বেষী সমাজব্যবস্থা থেকে আসতে পারে না। আমাদের মহান স্রষ্টা আমাদের জন্য যে শান্তির পথ নির্দেশ করেছেন, আমাদের সেই পথেই হাঁটতে হবে। বিশ্বপরিস্থিতির এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক অন্ধত্ব থেকে বেরিয়ে এসে সচেতন হতে হবে। সমস্ত ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে, ঈমান ও ঐক্যের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা গড়ে তুলতে পারব এমন এক সোনার বাংলাদেশ, যা হবে সারা বিশ্বের জন্য শান্তি ও ন্যায়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
(শিক্ষক ও কলামনিস্ট, ভধপবনড়ড়শ/মষধংহরশসরৎধ১৩)