


গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা কেবল একটি ব্যস্ত সড়ক সংযোগ নয় বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি সেনা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। দেশের ইতিহাসের প্রথম সেই সশস্ত্র প্রতিরোধের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়েছিল প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’। কিন্তু আজ চরম অবহেলায় এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি তার অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে।
ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের হাতে নির্মিত এই ভাস্কর্যটিতে বহু শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম খোদাই করা আছে। এটি এক সময় দূর থেকে সগৌরবে দেখা গেলেও বর্তমানে আশেপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবকাঠামো ও উড়ালসড়কের পিলারের ভিড়ে এটি চারপাশ থেকে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ভাস্কর্যটি এখন প্রায় জনচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, যে স্থাপনাটি ছিল জাতির গৌরব আর ত্যাগের প্রতীক, উন্নয়নের নামে সেটিকে অযত্ন আর অবহেলার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাস্কর্যটির চারপাশ এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দেয়ালে খোদাই করা শহীদদের নামগুলো সংস্কারের অভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং যত্রতত্র ব্যানার ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। এছাড়া দিনরাত ভারী যানবাহনের কম্পন আর ধুলোবালির কারণে এর কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে। স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক সময় আমরা সন্তানদের নিয়ে এখানে আসতাম মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস শোনাতে। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ধরণ আমাদের ইতিহাসকে ঢেকে ফেলছে।
বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজীপুরের সড়ক উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এই ঐতিহাসিক ভাস্কর্যটির মর্যাদা রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং সমন্বয়হীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে এই জনপদে সাধারণ মানুষের যাতায়াত দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি আড়ালে পড়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাও। স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনস্বার্থ আর জাতীয় আবেগ জড়িত এমন একটি স্থানে উন্নয়নের নামে কেন এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হলো?
গাজীপুরের মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহল বর্তমান সরকারের কাছে এই এলাকা ঘিরে অতীতে নেওয়া সব উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম ও ধীরগতির কারণ খুঁজে বের করতে একটি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, কেবল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জাগ্রত চৌরঙ্গীর মতো ঐতিহাসিক নিদর্শনের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। তারা দ্রুত এই ভাস্কর্যের চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করে এর দৃশ্যমানতা ও গরিমা ফিরিয়ে আনার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। ইতিহাসের এমন এক অনন্য সাক্ষী যেন অযত্নে হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।