


বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) তাদের অন্যতম। সোমবার, ১২ জানুয়ারি, এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টির ৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রগতিশীল আন্দোলনের শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়েছিল ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট, ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী ঢাকার ওপর শিক্ষা চাপ কমানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’।

ঢাকার অদূরে সাভারের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে অবস্থিত জাবির ক্যাম্পাস তার পরিকল্পিত আবাসিক কাঠামো ও ব্যতিক্রমী একাডেমিক পরিবেশের জন্য পরিচিত। মাত্র চারটি বিভাগ ও ১৫০ শিক্ষার্থী দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ এবং চারটি ইনস্টিটিউটে হাজারো শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করছে। দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে ছাত্রদের জন্য ১১টি এবং ছাত্রীদের জন্য ১০টি হল রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
একাডেমিক উৎকর্ষতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টাইমস হায়ার এডুকেশন ও কিউএস ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের শীর্ষস্থান অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী শ্রম ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও জাবির অন্যতম পরিচয়। লাল শাপলার বিল, অসংখ্য লেক, ঘন বনভূমি এবং শীতকালীন অতিথি পাখির আগমন জাবি ক্যাম্পাসকে প্রকৃতি ও জ্ঞানের এক অনন্য সহাবস্থানে পরিণত করেছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।
জাতীয় রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ঐতিহাসিক। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে জাবির শিক্ষার্থীরা দৃঢ় ও সাহসী পদচিহ্ন রেখেছে। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়ও শুরু হয়েছে।
সংস্কৃতিচর্চায়ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর অগ্রণী। নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, চারুকলা ও চলচ্চিত্রচর্চায় জাবির শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। ৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া আয়োজন, স্মৃতিচারণ ও বিশেষ দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রত্যয়ে জ্ঞান, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।