


শাহাদৎ হোসেন:
কিছু ক্ষত কখনো শুকায় না। কিছু স্মৃতি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সাথে সাথে ঝাপসা হয় না, বরং আরও গভীর আর দগদগে হয়ে ওঠে। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগের ২০২২ সালের এক বর্ষণমুখর রাত। তারিখটা ছিল ২৩ আগস্ট। পাবনার আকাশ সেদিন হয়তো শান্তই ছিল, কিন্তু চর ঘোষপুর গ্রামের মধ্যপাড়ার মণ্ডল পরিবারে এবং হেযবুত তওহীদের কর্মীদের হৃদয়ে যে কালবৈশাখী ঝড় উঠেছিল, তার ক্ষত আজও দগদগে। ২৩ আগস্টের সেই কালরাতে যে রক্তস্রোত পাবনার মাটি ভিজিয়েছিল তার দাগ আজও অমলিন। সেই রাতে আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, আমরা হারিয়েছিলাম এক সত্য আদর্শকে ধারণকারী সাহসী যুবককে, এক হবু পিতাকে, এক বিনয়ী বন্ধুকে। আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের আদর্শিক সহযোদ্ধা মো. সুজন মণ্ডলকে। তার তৃতীয় শাহাদাত বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ আমরা কেবল অশ্রুসিক্ত নই। আমরা ক্ষুব্ধ ও ন্যায়ের দাবিতে অবিচল।
সুজন মণ্ডলকে কোনো রাজনৈতিক দলের বড় নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। পাবনার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চর ঘোষপুর গ্রামের মধ্যপাড়ার মৃত আনিছুর রহমান মণ্ডলের ঘরে জন্ম নেওয়া সুজন ছিলেন মাটি ও মানুষের খুব কাছের একজন। একজন সাধারণ ওয়ার্কশপ মিস্ত্রি, যার শ্রমে ও ঘামে চলত মায়ের সংসার, যার হাসিতে পূর্ণতা পেত স্ত্রীর জীবন। এলাকার সবার কাছে তিনি ছিলেন একজন সৎ, স্বল্পভাষী, শান্তিপ্রিয় আর বন্ধুবৎসল যুবক। কিন্তু এই সাধারণ পরিচয়ের গভীরে তিনি ধারণ করতেন এক অসাধারণ স্বপ্ন। তার স্বপ্ন ছিল এমন এক সমাজ বিনির্মাণের, যেখানে উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল থাকবে না; থাকবে শুধু মানবতা, ন্যায় আর শান্তি। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংস্কারমূলক আন্দোলন হেযবুত তওহীদে যোগদান করলেন। মিষ্টভাষী এই যুবক গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় সব জায়গায় তওহীদের বাণী পৌঁছে দিতে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করতেন। চায়ের দোকানে যখন মানুষ অসাড় কথাবার্তায় ব্যস্ত, সুজন মন্ডল তখন তাদের কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে কালেমার দাওয়াত দিতেন। ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচার করতেন। মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করতেন। ধর্মের নামে অধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সমালোচনা করতেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এক সন্ত্রাসমুক্ত ন্যায়, সুবিচার ও শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের। তার এই স্বপ্ন অন্ধকারের শক্তির চোখে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
সেই ভয়াল রাতের ঘটনাপ্রবাহ আজও বিবেককে নাড়া দেয়। পাবনা শহরের ভাটামোড় এলাকায় হেযবুত তওহীদের জেলা কার্যালয়ে সহকর্মীদের সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন ছিলেন সুজন। তখন কে জানত, পাশেই ওঁৎ পেতে আছে একদল হায়েনা! স্থানীয় সন্ত্রাসী আলাল শেখ, তার ছেলে এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা চাপাতি, রামদা, হাঁসুড়ি আর হাতুড়ির মতো আদিম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কাপুরুষোচিত হামলা চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সংগঠনের জেলা সভাপতি, কিন্তু আদর্শের বীর সিপাহী সুজন মানববর্ম হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেই অন্যায়কে। নিরস্ত্র একজন মানুষের সাহসের কাছে পরাজিত হয়ে কাপুরুষেরা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তারা সুজনকে আলাদা করে ঘিরে ধরে। তারপর শুরু হয় নারকীয় বর্বরতা। হাতুড়ি দিয়ে তার শরীর থেঁতলে দেওয়া হয়, ধারালো হাঁসুয়া দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি কোপানো হয়। রক্তাক্ত, নিথরপ্রায় দেহটি যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন সেই দানবেরা তার বুকের উপর ভারী বস্তু ফেলে নিজেদের পৈশাচিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন রাখে।
যখন রাজশাহীর হাসপাতালে সুজনের প্রাণবায়ু নিভু নিভু করছিল, তখন বাড়িতে তার নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শাহানা খাতুন একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন। তিনি জানতেন না, তার জীবন্ত স্বামী আর কখনো ঘরে ফিরবেন না। ফিরবে তার রক্তস্নাত, প্রাণহীন নিথর দেহ। দীর্ঘ নয় বছরের দাম্পত্য জীবনের অপেক্ষার পর যে সন্তানের মুখ দেখার জন্য সুজন আর শাহানার অসীম আকুলতা ছিল, সেই অনাগত সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারলেন না বাবা। শাহানার সেই দিনের কান্নাভেজা আর্তনাদ আজও আকাশকে ভারী করে তোলে- “জীবন্ত একটা মানুষ বাসা থেকে বের হলো কিন্তু ফিরে আসলো রক্তাক্ত নিথর দেহে! সে তার সন্তানের মুখটাও দেখে যেতে পারলো না!
সুজনের সেই সন্তান আজ পৃথিবীর আলোয় বেড়ে উঠছে। তার বয়স এখন প্রায় তিন বছর। সে হয়তো আধো আধো বোলে ‘বাবা’ ডাকতে শিখেছে, কিন্তু সেই ডাক শহীদ সুজনের কানে কখনো পৌঁছবে না।
উগ্র সন্ত্রাসীরা মো. সুজন মন্ডলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। কিন্তু তারা জানেনা আল্লাহর তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য, সত্যের পথে সংগ্রাম করতে গিয়ে যারা জবীন উৎসর্গ করে তারা কখনো মরে না। তারা শহীদ। স্বয়ং আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা রিজিকপ্রাপ্ত হয়ে থাকে।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৬৯)
সন্ত্রাসীরা হয়ত এও ভেবেছিল যে, একজনকে হত্যা করলেই বুঝি আদর্শের মশাল নিভিয়ে দেওয়া যায়। তারা ভেবেছিল, ভয় দেখিয়ে সত্যের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিবে। কিন্তু তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। সুজনের মরদেহ যখন তার গ্রামে পৌঁছায়, তখন মানুষের যে বাঁধভাঙা ঢল নেমেছিল, তা ছিল সন্ত্রাসীদের প্রতি গণমানুষের তীব্র ঘৃণা আর প্রত্যাখ্যানের এক জীবন্ত দলিল। কিছু ধর্মব্যবসায়ী যখন সুজনের দাফনে বাধা দেওয়ার ঘৃণ্য অপচেষ্টা করেছিল, তখন এলাকার সাধারণ মানুষই তাদের রুখে দেয়। কারণ তারা তাদের সুজনকে চিনত; তারা দেখেছে তাকে বাবার আঙুল ধরে মসজিদে যেতে, দেখেছে সত্য ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম করতে। শহরে ও গ্রামে তার দুটি জানাজায় হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দিয়েছিল- এদেশের মানুষ চাপাতি আর রামদার পক্ষে নয়, তারা সুজনের পক্ষে, তারা মানবতার পক্ষে। সেদিন ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে সারা দেশে হেযবুত তওহীদের কর্মীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল- “এক সুজন শহীদ হলে, লক্ষ সুজন ঘরে ঘরে।”
কিন্তু আজ তিন বছর পর প্রশ্ন জাগে, সেই প্রতিবাদের আগুন কি বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছে? ঘটনার পর পুলিশি অভিযানে কয়েকজন আসামি আটক হয়েছিল, তারপর জামিনে বের হয়ে বুক ফুলিয়ে চলছে। বিচারের বাণী আজও নীরবে কাঁদছে। ২০১৬ সালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে হেযবুত তওহীদের আরও দুজন সদস্যকে একইভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা হয়তো পাবনার খুনিদের দুঃসাহসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য তৈরি করে।
শহীদ সুজনের পরিবার, তার বন্ধুমহল এবং দেশের শান্তিকামী মানুষ আজ রাষ্ট্র এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছে- সুজন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রতিটি খুনি এবং এর পেছনের মদদদাতাদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
সুজন আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার আত্মদান বৃথা যায়নি। তার ঝরে পড়া রক্ত এই মাটির প্রতিটি সত্যনিষ্ঠ কর্মীর শিরায় শিরায় প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তিনি আজ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি তওহীদ তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পক্ষে, অন্যায়-অবিচার আর ধর্মের নামে অধর্মের বিরুদ্ধে পৃথিবীতে সত্যের মশালবাহক এক জ্বলন্ত সংগ্রামের প্রতীক। যতদিন এই মাটিতে একজন সন্ত্রাসীও বুক ফুলিয়ে হাঁটবে, যতদিন ধর্মের নামে মিথ্যাচার চলবে, ততদিন সুজনের সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাবে। তার রক্তস্নাত স্মৃতি আমাদের প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেয়- অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা নয়, ন্যায়ের জন্য লড়াই করে জীবন দেয়াই জীবনের সার্থকতা।