Date: May 15, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / চট্টগ্রাম / ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ প্রমাণের পরও ভেঙে পড়লেন সেই ইমাম, মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে স...

ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ প্রমাণের পরও ভেঙে পড়লেন সেই ইমাম, মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

May 15, 2026 09:26:18 PM   অনলাইন ডেস্ক
ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ প্রমাণের পরও ভেঙে পড়লেন সেই ইমাম, মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

ফেনীর ইমাম মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়েরের জীবন যেন এক নির্মম ট্র্যাজেডির নাম। ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ, সামাজিক অপমান, চাকরি হারানো এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি তিনি। মানসিক চাপ ও সামাজিক লাঞ্ছনার ভার সইতে না পেরে বর্তমানে রাজধানীর একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই আলেম।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মামলায় কারাবন্দি থাকার সময় থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়ের। একপর্যায়ে কারাগারে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন বলে জানা গেছে। দেয়ালে মাথা ঠুকে নিজেকে আঘাত করার ঘটনাও ঘটে। পরে মুক্তি পেলেও মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা-র ছোট ভাই ইমনের বাসায় অবস্থানকালে হঠাৎ তার আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। উপস্থিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বাসার আসবাবপত্র ভাঙচুর শুরু করেন এবং আশপাশের লোকজনের ওপর চড়াও হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়।

পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-এ নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেন। পরে তার পরিবার ঢাকায় পৌঁছালে উন্নত চিকিৎসার জন্য আদাবরের একটি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে তিনি পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুল আশরাফ কুশল তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-র কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা বলেন, একজন নির্দোষ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অপমান ও হতাশা থেকেই তিনি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

ঘটনার পেছনের ইতিহাসও বেশ চাঞ্চল্যকর। ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে একটি মক্তবপড়ুয়া কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মাওলানা জুবায়েরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল। পরে ৩২ দিন কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান।

পরবর্তীতে মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে বেরিয়ে আসে, ওই কিশোরীর সন্তানের জৈবিক বাবা আসলে তার নিজের ভাই। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। কিন্তু ততদিনে মাওলানা জুবায়েরের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

অসুস্থ হওয়ার কয়েক দিন আগে ফেনীতে এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। অভিযোগ করেছিলেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই তাকে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মামলার খরচ চালাতে পৈতৃক জমিও বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল, মিথ্যা মামলায় জড়িতদের শাস্তি এবং মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। তার এ দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এনসিপির নেতারাও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হলেও সামাজিক অপবাদ, আইনি জটিলতা ও মানসিক আঘাত একজন মানুষের জীবনকে কতটা বিপর্যস্ত করে দিতে পারে—মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়েরের ঘটনা যেন তারই এক করুণ উদাহরণ।