


বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো এক বাস্তব ঘটনার জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (USC) একদল নিউরোসার্জন। তারা প্রথমবারের মতো মানুষের মস্তিষ্কে সফলভাবে স্থাপন করেছেন এক ধরনের “মেমরি প্রোস্থেসিস”, বা স্মৃতি প্রতিস্থাপন চিপ, যা ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মানুষের শেখার ক্ষমতা ও দক্ষতাও ‘আপলোড’ করতে পারে—যেন কোনো কম্পিউটারে ফাইল ট্রান্সফার হচ্ছে!
চিপটি মূলত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশের কাজ অনুকরণ করে, যেটি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরি করে। এতে রয়েছে ৩২টি ইলেকট্রোড, যা স্মৃতি-সম্পর্কিত নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। শেখার সময় এটি মস্তিষ্কের সক্রিয় নিউরাল প্যাটার্ন রেকর্ড করে রাখে, এবং ঘুমের সময় সেই প্যাটার্নগুলো পুনরায় চালু করে দেয়। এর ফলে স্মৃতি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া হয় আরও কার্যকর ও স্থায়ী—প্রাকৃতিক হিপোক্যাম্পাসের চেয়েও দক্ষভাবে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৮ জন গুরুতর স্মৃতিভ্রষ্ট রোগীর ওপর এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়। ১৪ মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নতুন স্মৃতি তৈরির ক্ষেত্রে তাদের পারফরম্যান্স গড়ে ৩৭ শতাংশ উন্নত হয়েছে। অনেকেই আবার কথোপকথন, মুখ বা পুরনো ঘটনার স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে পারছেন।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই প্রযুক্তি এখন শুধুমাত্র স্মৃতি ফিরিয়ে আনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং গবেষকরা মানুষের দক্ষতা “আপলোড” করার পরীক্ষাও চালাচ্ছেন। এক বিশেষজ্ঞ যখন কোনো কাজ করছেন, তখন তার মস্তিষ্কের নিউরাল প্যাটার্ন রেকর্ড করা হয়। পরে সেই প্যাটার্ন ঘুমের সময় অন্য একজনের মস্তিষ্কে প্রেরণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে এক রোগী ম্যান্ডারিন ভাষার শব্দভান্ডার প্রায় ৪০ শতাংশ দ্রুত শিখতে সক্ষম হন, যেখানে উৎস প্যাটার্ন নেওয়া হয়েছিল একজন সাবলীল বক্তার কাছ থেকে।
তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এখনো এটি কেবল তথ্য ও ঘটনার স্মৃতি, অর্থাৎ “ডিক্লারেটিভ মেমরি”, পুনরুদ্ধারে কার্যকর। জটিল দক্ষতা যেমন সাইকেল চালানো বা অস্ত্রোপচার শেখা এখনো সম্ভব নয়। তাছাড়া মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়, যার খরচ প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার, এবং বর্তমানে কেবল গুরুতর স্মৃতিভ্রষ্ট রোগীদের জন্যই এটি অনুমোদিত।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিনেমা Matrix-এর মতো “I know Kung Fu” মুহূর্ত হয়তো এখনো অনেক দূরে, কিন্তু এই মেমরি চিপের সাফল্যই হয়তো সেই ভবিষ্যতের প্রথম পদক্ষেপ—যেখানে মানুষের মস্তিষ্কে জ্ঞান ও দক্ষতা সরাসরি ‘আপলোড’ করা আর কল্পনা নয়, বাস্তবতা হয়ে উঠবে।