Date: April 18, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / রংপুর / রংপুরে মামলা তুলে নিতে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের প্রকাশ্য সমাবেশ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার ক...

রংপুরে মামলা তুলে নিতে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের প্রকাশ্য সমাবেশ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

April 18, 2026 03:36:14 PM   জেলা প্রতিনিধি
রংপুরে মামলা তুলে নিতে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের প্রকাশ্য সমাবেশ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় মব সন্ত্রাস, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত প্রধান আসামির প্রকাশ্য সমাবেশকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গ্রেপ্তার না করে উল্টো তার বেআইনি সমাবেশে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পারুল ইউনিয়নের নাগদহ এলাকায় গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দিবালোকে গুজব ছড়িয়ে একদল উগ্রবাদী চক্র মব তৈরি করে হেযবুত তওহীদ সদস্যদের অন্তত ১২টি বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে মুহূর্তেই বসতভিটা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে বহু পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে এবং এখনও চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে থানা ও আদালতে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় স্থানীয় ‘ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি’ নুর আলমকে প্রধান আসামি করা হয়। তাকেসহ মামলার অন্যান্য আসামীদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরোয়ানা কার্যকর না করায় তিনি প্রকাশ্যে সমাবেশ করে মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।

আজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পারুল ইউনিয়নাধীন নাগদহ এলাকায় ওই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের রাত থেকেই মাইকিং করে সংবাদ সম্মেলনের নামে পুরো ইউনিয়নে লোকসমাগমের আহ্বান জানায় মামলার এক নম্বর আসামি অভিযুক্ত নুর আলম। এতে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই বেআইনি সমাবেশের বিষয়ে তারা অনুমোদন নেয়নি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে।

প্রত্যক্ষদর্শী‌ ও স্থানীয়রা জানান, সকাল থেকেই উপজেলার পারুল ইউনিয়নের নাগদাহ চৌরাস্তা মোড়ে সমাবেশস্থলে লোকজন জড়ো হতে থাকে এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল। তবে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি উপস্থিত থাকলেও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং পুরো সমাবেশে পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এমন অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘটনাস্থলের পাশে পারুল ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা বিট পুলিশ উপস্থিত ছিল। এছাড়াও সমাবেশের শুরুতে দুই গাড়ি পুলিশ এসে টহল দিয়েছে এবং প্রোগ্রামের শেষে তারা চলে গিয়েছে। তবে এবিষয়ে স্থানীয় পারুল ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা বিট পুলিশের এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সমাবেশ স্থলের খানিকটা দূরে থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে বিষয়টি দেখে চলে এসেছি। এর বাহিরেও কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

এনামুল নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আমরা ভেবেছিলাম ওয়ারেন্টভুক্ত আসমীদের গ্রেপ্তার করবে পুলিশ অথচ সমাবেশের শুরুতে দুই গাড়ি পুলিশ এসে টহল দিয়ে চলে গেছে। গ্রেপ্তার না করে সমাবেশের পাশে পুলিশের এমন টহল দেওয়া নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, “যে ব্যক্তিরা আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, তারাই আজ মামলা তুলে নিতে প্রকাশ্যে সমাবেশ করছে। অথচ আমরা মামলা করেও এখনও সহায় সম্বল হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মন্তাজ উদ্দিন, চান মিয়া ও আবুল কালাম অভিযোগ করেন, গতবছর গুজব ছড়িয়ে মসজিদের মাইকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়। তারা বলেন, “আমরা বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করেছি। এখন সেই মামলার আসামিরাই উল্টো সমাবেশ করে আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। নতুন করে তারা পুরনো কায়দায় মবের পায়তারা করছে বলেও অভিযোগ করেন।”

হেযবুত তওহীদের রংপুর বিভাগীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস শামীম বলেন, “ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার না করে তাদের সমাবেশে পুলিশের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে মব সংস্কৃতি উৎসাহ পাচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, গতকাল থেকে বিষয়টি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আসামিরা গুজব রটিয়ে মব তৈরি করে আমাদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ চালিয়েছে। কিন্তু নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও তারা মবের অপচেষ্টার পায়তারা করছে। আমরা এই ঘটনায় স্থানীয় সাংসদসহ রংপুরের পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগাছা থানার ওসি একেএম খন্দকার মহিব্বুল জানান, “সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ গিয়েছিলো। তবে প্রকাশ্যে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি বক্তব্য দিয়ে বাদি বিপক্ষের মামলা তুলে নিতে হুমকি ধামকি দিলেও তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি বলে বিষয়টি এভাবেই এড়িয়ে যান তিনি।”

রংপুর জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন ‘মাপা’ এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এমএম মনির চৌধুরী বলেন, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে দেখামাত্র গ্রেপ্তার করে আদালতের সোপর্দ করা পুলিশের কাজ। তবে গ্রেপ্তার না করে প্রকাশ্যে সমাবেশ করতে দেওয়ার ঘটনা আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন হলে ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে বলেও জানান তিনি।

এদিকে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি উপজেলার পারুল ইউনিয়নের নাগদাহ ছিদাম বাজার সংলগ্ন হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের বিভাগীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস শামীমের বাড়িতে একটি প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, পার্শ্ববর্তী নাগদাহ এলাকার একদল উগ্রবাদী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে ওই অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে একাধিক বসতবাড়ি ও প্রায় ২ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। মামলার সূত্রে জানাযায় ওই হামলার নেতৃত্ব দেন স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি নুর আলম। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে থানা ও আদালতে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে।