


হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম:
ইসলামের দার্শনিক ভিত্তি হলো- মানুষ সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহর সাথে ইবলিসের একটা চ্যালেঞ্জ হয়েছে। ইবলিস হলো এমন একটা সত্তা যে মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে আর আল্লাহ ন্যায় ও সত্যের দিকে ধাবিত করেন। ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে যে, সে মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে তাদের মধ্যে অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা, অন্যায়, অবিচার, যুলুম, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা, রক্তপাত ইত্যাদি ঘটাবে আর আল্লাহ এগুলো থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য যুগে যুগে নবী-রসুল, পথপ্রদর্শক (হাদি) পাঠাবেন। যারা আল্লাহর পাঠানো হেদায়াহ বা সঠিক পথনির্দেশনা মেনে চলবে তাদের মধ্যে আর এই অন্যায়, অবিচার, অশান্তি, রক্তপাত হবে না এবং তারা আখেরাতে জান্নাতে যাবে। সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য অশ্লীলতা হলো ইবলিসের একটি হাতিয়ার।
এজন্য গান, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির মধ্যে যদি অশ্লীল কিছু না থাকে, অন্যায্য কিছু না থাকে, অনর্থক কিছু না থাকে বরং অর্থবহ কথা, মানবতার কথা, ঐক্যের কথা থাকে, আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণার কথা থাকে, মা-মাটি-মানুষের কথা থাকে, সাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে সমগ্র মানবজাতিকে একজাতিতে পরিণত করার কথা থাকে সেগুলো হারাম হবার কোনোই কারণ নেই, বরং সেগুলো প্রশংসনীয় কাজ হবে। আরবের মানুষ দফ বাজিয়ে গান গাইত, রসুলাল্লাহ (সা.) নিজেও গান শুনেছেন। গান-বাদ্যের বিরুদ্ধে একটা হাদিস উল্লেখ করা হয় যে, তিনি একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি বাঁশি বাজানোর শব্দ শুনে তিনি দু’কানে আঙুল দিয়ে সেদিক দিয়ে চলে যান। পরে তিনি বলেন, ‘নাফে, তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি?’ নাফে বলেন, ‘না।’ তখন তিনি আঙুল কান থেকে সরিয়ে নেন। (আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে ইবনু মাজাহ-৩৬৫০ ও আবু দাউদ- ৪৯৩০)। ইতিহাস বলে, তখন রসুলাল্লাহ (সা.) মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে নৈতিক ও সামাজিক শাসক। তিনি কিন্তু বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে বের করেননি, তাকে ধরে এনে শাস্তিও দেন নি, বাঁশি ভেঙ্গেও ফেলেন নি। হয়ত কোনো কারণে বাঁশির আওয়াজটা তাঁর পছন্দ হয়নি। আমাদের কাছেও কিন্তু সব ধরনের সঙ্গীত, সব ধরনের সুর পছন্দ হয় না। কাজেই সেই নির্দিষ্ট বাঁশির সুর রসুলাল্লাহর অস্বস্তির কারণ হতেই পারে, এতে গান-বাদ্য হারাম হয়ে যায় না। হারাম হলে তিনি ফরমান জারি করতেন, বাঁশি ভেঙ্গে ফেলতেন, বাদকদের শাস্তির ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই তিনি করেন নি।
প্রশ্ন ওঠে, আমরা হেযবুত তওহীদ যে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রস্তাব করছি সেখানে সিনেমা হল থাকবে কিনা। আমরা তার উত্তরে বলতে চাই- বর্তমানে তো সিনেমা হল নেই বললেই চলে। জেলা শহরগুলোতে যে হলগুলো আছে সেগুলোও অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ যেখানে উন্নতমানের সিনেমা হল থাকবে, যাতে মানুষকে বিদেশে গিয়ে মাল্টিপ্লেক্স থিয়েটারে মুভি বা কনসার্ট দেখে ডলার ব্যয় করতে না হয়। বর্তমানে হলিউড এত উন্নতমানের সিনেমা তৈরি করে যে আমরা সেগুলো দেখে বোয়াল মাছের মতো হা করে থাকি। তারা সিনেমা তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে। সেখানে তারা তাদের জাতির গৌরব, মর্যাদা ও শক্তি সামর্থ্যকে তুলে ধরে; অবশ্য বহু ক্ষেত্রে অশ্লীলতার বিস্তারও ঘটায়। কিন্তু আমাদের সিনেমা এখনও প্রেম ও বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেগুলো এতটাই মানহীন আর হলের পরিবেশ এতটাই খারাপ যে রুচিশীল শিক্ষিত মানুষ আর হলে যায় না। আমাদের সংস্কৃতি তো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। আমরা সেই হারানো সংস্কৃতির একটা পুনর্জাগরণ ঘটাতে চাই। সংস্কৃতির নামে যেখানে কেবল স্বার্থ উদ্ধারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে তাকে কখনওই সুস্থ সংস্কৃতি বলা যায় না।
মধ্যযুগে (৬০০ খ্রি.-১৭০০ খ্রি.) মুসলিম শাসনামলে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং ভারতবর্ষে সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছিল। ইসলামী দর্শনের জনক আল-ফারাবি’র বিখ্যাত সঙ্গীতগ্রন্থ ‘কিতাব আল-মুসিকি আল-কবির’ (সংগীতের মহান গ্রন্থ) এখনও সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস এবং সঙ্গীততত্ত্ব গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। উমাইয়্যা, আব্বাসীয়, সেলজুক, অটোমান এবং মুঘল শাসকরা শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। সে সময় মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, দরবার এবং প্রাসাদগুলো শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্রই নয়, শিক্ষার ও শিল্পকলার বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হত।
সংগীত এবং সাহিত্য এই সময়ে বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। মুঘল শাসনামলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীত চর্চা হত। তখন হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলনে নতুন রাগ-রাগিনী এবং সংগীতধারার সৃষ্টি হয়েছিল। সম্রাট আকবরের নবরত্নের অন্যতম মিয়া তানসেনের সৃষ্টি মিয়া কি মালহার, দরবারি কানাড়া, মিয়া কি টোড়ি এ সময়ের নতুন রাগ হিসেবে গণ্য। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.) ও হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর মতো মহান সুফি সাধকরা তাঁদের খানকাহে ‘সামা’ বা ‘কাওয়ালি’ সংগীতকে ব্যবহার করতেন আধ্যাত্মিকতা, আল্লাহর প্রেম, মানবতা ও আত্মশুদ্ধির পথ প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। অনেকে বলেন গজল জায়েজ, গান জায়েজ নয়। কী আর বলব! অজ্ঞতার কোনো সীমা নেই। গজল বলতে তারা বোঝান বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ধর্মীয় সঙ্গীত হামদ নাত ইত্যাদি। অথচ আরবিতে গজল শব্দের অর্থই হলো- ‘প্রেমিকার সাথে কথোপকথন’, ‘প্রেমালাপ’ কিংবা ‘রমণীর সঙ্গে বাক্যালাপ’। অষ্টম শতাব্দীর আগ পর্যন্ত আরবি সাহিত্যকর্মে গজলকে এভাবেই ব্যবহার করা হতো। কিন্তু নবম শতাব্দী থেকে সুফি সাহিত্যিকরা গজলকে নতুন অর্থে ও আঙ্গিকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তারা এটিকে মাসুক (স্রষ্টা) ও আশেক (বান্দা) সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা এবং স্রষ্টার ঐকান্তিক প্রেম প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে রচনা করতে থাকেন।
মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতা বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এই সময়ে উদ্ভাবিত এবং উন্নতকৃত প্রধান বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ (Oud), কানুন (Qanun), রাবাব (Rabab), নাফির (Nafir) এবং তাম্বুরা/তানপুরা (Tambourine)। এই বাদ্যযন্ত্রগুলো মুসলিম সমাজে বিনোদন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ ছিল। পরবর্তীতে এই বাদ্যযন্ত্রগুলো ইউরোপে ছড়িয়ে গিয়ে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন উদ থেকে ল্যুট ও গিটার, নাফির থেকে ট্রাম্পেট সৃষ্টি হয়েছে।
আমাদের দেশের কৃষকেরা যখন দলবেঁধে কৃষিকাজ করেন, তখন তারা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়া গান ধরেন। এই গান তাদের কর্মোদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তপ্ত রোদের মধ্যে যখন কৃষক দলবেঁধে ধান কাটেন, তখন উদ্দীপনা প্রয়োজন হয়। এই গান তাদের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে, কাজে নতুন শক্তি যোগায়। আল্লাহ তা’আলা মানুষের মনকে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। সুর ও সঙ্গীত মানুষের কষ্ট দূর করে, ক্লান্তি দূর করে, মনে প্রশান্তি আনে।
দাউদ (আ.)-কে আল্লাহ এমন সুমধুর কণ্ঠ দান করেছিলেন যে, পাহাড়-পর্বত ও পাখিরা তাঁর সঙ্গে মিলেমিশে আল্লাহর তসবিহ পাঠ করত। আযানের সুরে আমরা আজও মোহিত হয়ে যাই, যদি সুললিত কণ্ঠে মুয়াজ্জিন আযান দেন। সুরকে আল্লাহ মানুষের কাছে এতটাই মোহনীয় করেছেন যে, আলেমরাও সাধারণ কথা ওয়াজের মাহফিলে সুর করে বলেন। আল্লাহ এই সুরকে মানুষের জন্য মোহনীয় করে সৃষ্টি করেছেন। কাকের কর্কশ কা-কা ধ্বনি শুনতে কারো ভালো লাগে না। কিন্তু কোকিলের কুহুতান মানুষের মন কেড়ে নেয়। এজন্যই ইমাম গাজ্জালি (র.) বলেছেন, কোকিলের বা মানুষের কণ্ঠনিসৃত সুর বা তারযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট সুর হারাম নয় (ইহ্ইয়াউ উলুমুদ্দিন-এর ‘কিতাব আদাবুস সামা ওয়াল ওয়াজদ’ অধ্যায়)। তবে সঙ্গীতের নামে উম্মাদনা, অশ্লীলতা এবং উচ্চশব্দের সঙ্গীত, যা মানুষের বিরক্তি সৃষ্টি করে এবং মন ও আত্মার ক্ষতি করে, তা নিষিদ্ধ হওয়া ইসলামের দাবি।
আমরা মনে করি, সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে একটি সেন্সর বোর্ড থাকা জরুরি। এই সেন্সর বোর্ডের কাজ হবে শুধু গানের কথা, নাটক, সিনেমা বা শিল্পের যেকোনো মাধ্যমে ঐক্য নষ্টকারী, বিদ্বেষমূলক, অশ্লীলতার প্রচার, আল্লাহর নাফরমানি ইত্যাদি অকল্যাণকর উপাদান আছে কি না তা পরীক্ষা করা। যদি না থাকে, তবে সেই শিল্পচর্চাকে রাষ্ট্র সহযোগিতা করবে। আর যদি এ ধরনের উপাদান থাকে, তাহলে সেটা সংশোধনের নির্দেশ দেবে।
রসুলাল্লাহ (সা.) এই কাজটিই করেছেন, সেন্সর করেছেন। রসুলাল্লাহর নারী সাহাবি রুবাই বিনতে মুআব্বিয ইবনু আফরা (রা.) বলেন, ‘আমার বাসর রাতের পরের দিন নবী (সা.) এলেন এবং আমার বিছানার ওপর বসলেন, যেমন বর্তমানে তুমি আমার কাছে বসে আছ। সে সময়ে মেয়েরা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদর যুদ্ধে শাহাদাত প্রাপ্ত আমার বাপ-চাচাদের শোকগাঁথা গাচ্ছিল। তাদের একজন গাচ্ছিল, আমাদের মধ্যে এক নবী আছেন, যিনি ভবিষ্যৎ জানেন। তখন রসুলুল্লাহ্ বললেন, এ কথাটি বাদ দাও, আগে যা গাইছিলে তাই গাও (সহিহ বোখারী, হাদিস নং ৫১৪৭)।’ লক্ষ করুন, এখানে রসুলাল্লাহ (সা.) মেয়েদেরকে গান গাইতে বারণ করলেন না, কিন্তু তাঁর ব্যাপারে একটি মিথ্যা ধারণা তিনি সংশোধন করে দিলেন।
কাজেই আমরা কারও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বা শিল্পচর্চা বন্ধ করার পক্ষে নই। আমরা কেবল চাই, শিল্প-সংস্কৃতি অশ্লীলতা এবং শিরক-কুফরমুক্ত হোক। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট- আপনি যত পারেন গবেষণা করুন, সংগীত চর্চা ও সাধনা করুন, সিনেমা তৈরি করুন, নাটক নির্মাণ করুন, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা করুন, নৃত্যকলা, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য তৈরি করুন- সবই করতে পারবেন। তবে শর্ত একটাই, তা হতে হবে অশ্লীলতা, শিরক ও কুফরমুক্ত। এই সীমারেখা না রাখলে মানব সমাজ ও সভ্যতা বিপন্ন হয়ে যাবে।
আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করব এবং বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করব, তবে অন্যদের সংস্কৃতিকে অসম্মান করব না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীরও আলাদা সংস্কৃতি রয়েছে, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদেরও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। আমরা তাদের এই বৈচিত্র্যকে সম্মান ও মর্যাদা দেব। কোনোভাবেই তাদের সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না। তবে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা অনুসারে যদি কোনো সংস্কৃতির নির্দিষ্ট অংশ অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা ছড়ায়, দ্বন্দ্ব-সংঘাত উস্কে দেয়, অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়, জুয়া বা অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়ায় -অর্থাৎ সমাজ ও জাতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে রাষ্ট্রের বিধিবদ্ধ আইনের মাধ্যমে সংশোধনের জন্য তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে আমাদের অধিকাংশের বেড়ে ওঠা ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমরা এই সংস্কৃতির ছোঁয়া পেয়েছি। প্রথা অনুযায়ী, আমাদেরকে প্রথম শোনানো হয়েছে আজানের মধুর ধ্বনি, কোনো হিন্দি গান বা অন্য কিছু শোনানো হয়নি। আল্লাহর নামই সবার আগে আমাদের কানে দেওয়া হয়েছে। এটাই আমাদের সংস্কৃতি। সাত দিন পর আমাদের নাম রাখা হয়েছে। এগুলো কী ধরনের নাম? আল্লাহর সিফতি নাম, যেমন আব্দুল খালেক, আব্দুল মালেক, আব্দুল জাব্বার, আব্দুর রাজ্জাক ইত্যাদি। এছাড়া নবী পরিবার ও সাহাবাদের নামে, কিংবা কোর’আনের সুন্দর ও অর্থবোধক শব্দ থেকে নাম রাখা হয়। এটি আমাদের মুসলিমদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
অন্যদিকে, পহেলা বৈশাখে আমাদের গ্রামগঞ্জে বৈশাখী মেলা বসত। সেখানে হিন্দু-মুসলিম সকলেই দোকান দিত, কেনাকাটা করত। পিঠা-পুলি, মণ্ডা-মিঠাই খাওয়া হত। বাড়িতে বাড়িতে নানা ধরনের রান্না হত এবং আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করত। দোকানগুলোতে হালখাতা হত। সেখানেও মিষ্টি খাওয়া হত, দোকানের আগের বাকি পরিশোধ করা হত এবং নতুনভাবে খাতায় নাম লেখা হত। পাড়া-মহল্লায় উৎসবমুখর একটি পরিবেশ বিরাজ করত। এগুলো আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির পরিচায়ক। সকল ধর্মের মানুষই এই ধরনের সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত হয়। বর্তমানে এই বিষয় নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ জায়েজ কি না-জায়েজ সেই প্রশ্ন উঠছে। কারণ পহেলা বৈশাখের মূল বার্তা আজকের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সেই আনন্দঘন পহেলা বৈশাখ আর নেই। কৃষকের ঘরে সেই আনন্দও হারিয়ে গেছে।
আবার আমাদের সংস্কৃতি ছিল শবে বরাত, শবে কদর। সারাদিন মা-চাচীরা নারিকেলে হালুয়া, চাউলের গুড়ার রুটি বানাতেন, গোশত রান্না করতেন, হালুয়া করতেন। নিজেরা খেতাম, প্রতিবেশী, গরিব-দুখিদের মাঝে বিলিয়ে দিতাম। সারা রাত মসজিদে মসজিদে মানুষ নামাজ পড়ত, মিলাদ হত। আবার ঈদ আসলে সবাই মিলে নতুন জামা পরে ঈদগাহে যাওয়া, শেমাই খাওয়া, কোলাকুলি করা, আনন্দ করা এবং কোরবানির ঈদের পশু কোরবানি করা - এগুলো সবই আমাদের মুসলিম সংস্কৃতির অংশ। এখন একদল লোক বলছে কোরবানি বন্ধ করতে হবে, আরেক দল বলছে পহেলা বৈশাখ হারাম, ওটা হিন্দুয়ানি। এই মানসিকতা দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে- আমার সংস্কৃতিকে সম্মান দেওয়া, আমার সংস্কৃতির চর্চা করা, আমার সংস্কৃতিকে তুলে ধরার অধিকার যেমন আমার আছে, আপনার সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করা, শ্রদ্ধা করা, তুলে ধরার অধিকার আপনার আছে।
ইসলাম কখনো শেখায়নি যে, কপালে টিপ দিয়েছেন বলে আপনাকে রাস্তায় হেনস্তা করা হবে; তেমনি আমি মাথায় টুপি দিয়েছি বলে আমাকে মোল্লা বা উগ্রবাদী হিসেবে হেনস্তা করা হবে। এগুলোই বাড়াবাড়ি ও অসহিষ্ণুতা। আসুন আমরা একটা শুদ্ধ, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করি। ইসলাম সংস্কৃতি চর্চার পথকে রুদ্ধ করেনি। ইসলাম একটি উদারনৈতিক জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনে শান্তি চায় ইসলাম। ইসলাম চায় আমাদের ভেতরের মানবিক সত্তার প্রকাশ ঘটুক। আমরা জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাই -এটাই ইসলাম চায়। তেমনি মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আল্লাহর খলিফা, আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহর সীমারেখার কথা ভুলে গেলে চলবে না। একদিকে একদল মানুষ না খেয়ে মারা যাবে, অন্যদিকে অন্যদল কোটি কোটি টাকা অপচয় করবে সংস্কৃতি চর্চার নামে বেহায়াপনার বিস্তার ঘটাবে। ইসলাম এটা মেনে নেয় না।
আপনি যদি ফ্রান্স বা ইউরোপের অন্যান্য দেশে যান, তাহলে দেখবেন তারা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও পৌরাণিক চরিত্রগুলোর মূর্তি বানিয়ে রেখেছে বিভিন্ন জায়গাতে। মূর্তিগুলো একেবারে নগ্ন। একেকটি মূর্তির একেকটি অর্থ তারা প্রকাশ করেছে। তাদের সংস্কৃতিতে এটা হয়ত স্বাভাবিক, কিন্তু এ ধরনের ভাস্কর্য আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না।
আমাদের গ্রামীণ সমাজের মানুষগুলো এমন পরিবেশে বড় হয় যে, ছোট বেলা থেকেই হাঁটুর উপরে কাপড় উঠলে সে সচেতন হয়ে যায়। ঘুমাতে গেলেও লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে ঘুমায় যেন কোনোভাবে কাপড় হাঁটুর উপরে উঠে না যায়। এটা আমাদের সংস্কৃতি। এখন আধুনিক সংস্কৃতি চর্চার নামে যদি রাস্তার মাঝখানে একটি উলঙ্গ ভাস্কর্য দাঁড় করানো হয়, তা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। আমাদের সংস্কৃতির ধারাকে বুঝতে হবে এবং তাকে সম্মান করতে হবে। আমরা কিন্তু এটা দেখে অভ্যস্ত হইনি যে, আমাদের মা-খালারা নগ্নভাবে চলবেন, শরীর প্রদর্শন করবেন।
আমাদের মা-খালা, দাদি-নানিরা শাড়ি পরেছেন, কেউ বা সালোয়ার-কামিজ পরেছেন। এর মধ্যে শহরের পরিবেশ, গ্রামের পরিবেশ, কৃষি পরিবার, ধনী-দরিদ্রের মাঝে পোশাক ও পরিচ্ছদের কিছু বৈচিত্র্যও অবশ্যই ছিল। তবে সার্বিকভাবে আমাদের নারীরা যেমন নগ্নভাবে চলতেন না, আবার আপাদমস্তক প্যাকেটবন্দীও থাকতেন না। একটা ভারসাম্যপূর্ণ শালীনতাবোধ তারা বজায় রাখতেন।
আজ সেই ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে পোশাকের স্বাধীনতার নামে ও শিল্প অঙ্গনে নগ্নতা (Indecent exposure) বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে ধর্মের নামে নারীদের গৃহবন্দী করার প্রবণতাও বাড়ছে। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট: এই বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। ইসলামে চরমপন্থা ও উগ্রপন্থা নিষিদ্ধ। ইসলাম হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ দীন (দীনুল ওয়াসাতা), তাই নারীর পোশাকরীতি ও আচরণের মধ্যেও সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার সমাজব্যবস্থাকে পরমত সহিষ্ণু ও উদারনৈতিক বলা হয়। তবে আমি বলব, ইসলাম তার থেকেও বেশি উদার ও পরমত সহিষ্ণু। অপরদিকে জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে, পশ্চিমা বিশ্ব যেমন বিধিবদ্ধ আইন প্রয়োগে কঠোর ও আপসহীন, তেমনি ইসলামও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগে কঠোর ও আপসহীন।
আজ পৃথিবী জুড়ে চলছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জয়জয়কার। তরুণ সমাজ হলিউড বলিউডের মুভি দেখছে, তাদের তারকাদের অনুকরণ করছে, ইংরেজি ও হিন্দি গান শুনছে। এই পরিস্থিতিই প্রমাণ করে যে দু’শ কোটির মুসলিম জাতির কোনো ভালো চলচ্চিত্র নেই; ভালো অনুকরণীয় শিল্পী নেই। এর কারণ হলো আমরা জাতিগতভাবে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। সংস্কৃতিচর্চার অনিবার্য চাহিদা পুরণে ব্যর্থতার ফলে আমাদের তরুণ সমাজ অপ-সংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে।
একসময় মুসলিম সাহিত্যিকরা বিশ্বমানের সাহিত্য রচনা করেছেন। যে সাহিত্যের মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ, ন্যায়-নীতি-নৈতিকতা ও ইসলামি সংস্কৃতি যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি মানুষ সেই সাহিত্যকর্ম থেকে সাহিত্য-রস আস্বাদন করেছে। কিন্তু আজ সেই মানের কোনো সাহিত্য মুসলিমদের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে না। কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমেদ, পল্লিকবি জসীম উদ্দীন, গোলাম মোস্তফাসহ যে বাঙালি মুসলিম কবি-সাহিত্যিক ছিলেন, তারা অসাধারণ সকল সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আজ সেই সাহিত্যিক কোথায়? ভালো সাহিত্য নেই, ভালো নাটক নেই, ভালো সিনেমা নেই, ভালো শিল্পী নেই। কাজেই এখন সবকিছুতেই আমরা বিদেশি সংস্কৃতির দ্বারস্থ। সবদিক থেকেই আমরা গোলাম।
এর মূল কারণ হলো: শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। দীন নিয়ে গোঁড়ামী ও বাড়াবাড়ির কারণে আমাদের এই দশা। আল্লাহ যা হারাম করেননি, আমাদের একশ্রেণীর আলেম সেগুলোকে হারাম ফতোয়া দিয়ে জাতিকে নিরুৎসাহিত করেছে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পথকে রুদ্ধ করেছে। এর বিষফল আমরা এখন ভোগ করছি। এখন সময় এসেছে, ইসলাম সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে। ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী যা বলে সেটাই ইসলাম নয়, আল্লাহ যেটা বলবেন সেটাই ইসলাম। ইসলামের মধ্যে বহু ফেরকাবাজি, বহু উগ্রবাদী দল এবং বহু ভিন্ন মত-পথ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা কি সকলের ভিন্ন মতকে ইসলাম হিসেবে গ্রহণ করব? না। একমাত্র কোর’আন ও কোর’আনের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ রসুলুল্লাহর (সা.) আদর্শই প্রকৃত ইসলাম। আমরা হেযবুত তওহীদ সেই প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার চেষ্টা করছি এবং এই আদর্শের ভিত্তিতে একটি নবজাগরণ বা রেনেসাঁ সৃষ্টি করতে ব্রতী হয়েছি।