Date: April 26, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা? - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?

April 26, 2026 01:04:10 PM   অনলাইন ডেস্ক
ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?

শাহাদৎ হোসেন:
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ ৪৭ বছরের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। গত ১১ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে, তাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা বলা যেতে পারে। প্রথম দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হলেও এটি কয়েক দশকের বৈরিতার পর একটি সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি করেছে। এখন সবার নজর বৃহস্পতিবারের সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বৈঠকের দিকে। আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো না গেলে মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।

প্রথম দফার বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল এক বড় চমক। শুরুতে ভাবা হয়েছিল তারা আলাদা ঘরে বসে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কথা বলবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সামনাসামনি বসেই আলোচনা করেছেন। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দুই পক্ষ নিজেদের দাবি ও শর্ত সম্বলিত লিখিত নথি বিনিময় করেছে। ইরান মূলত তাদের জব্দ করা অর্থ ফেরত পাওয়া এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।

এখন প্রশ্ন হলো দ্বিতীয় দফার বৈঠকে আসলে কী হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান একটি চুক্তিতে আসতে আগ্রহী এবং আগামী দুই দিনের মধ্যে বড় কিছু ঘটতে পারে। এই দ্বিতীয় দফার বৈঠকে মূল লক্ষ্য থাকবে ২২ এপ্রিলের পরও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো। পাকিস্তান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো চেষ্টা করছে যাতে দুই পক্ষ অন্তত একটি অন্তর্র্বতীকালীন চুক্তিতে সই করে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু অর্থ ছাড় দেয় এবং বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে স্থিতিশীলতা ফিরবে।

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। যখন ওয়াশিংটনে ৩৩ বছর পর ইসরায়েল ও লেবানন সরাসরি আলোচনায় বসেছে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত আছে। নেতানিয়াহুর লক্ষ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে দেওয়া। অন্যদিকে ট্রাম্প চাইছেন একটি দ্রুত ব্যবসায়িক সমাধান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হয় এবং যুদ্ধের খরচ কমে। এই দুই নেতার লক্ষ্য ও কৌশলের ভিন্নতা আলোচনার ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সংঘাতের পরিণতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় আটকে নেই। আমরা দেখেছি গত ফেব্রুয়ারিতে হামলার পর বিশ্ব কীভাবে পারমাণবিক যুদ্ধের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে এবং কয়েক লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আমাদের ঘরের অর্থনীতিকেও সংকটে ফেলছে।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামাবাদের দ্বিতীয় দফার বৈঠকটি হবে এক বিশাল পরীক্ষা। যদি এখানে কোনো ইতিবাচক সমঝোতা হয়, তবে তা হবে কূটনীতির জয়। আর যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে ২২ এপ্রিলের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট তাদের সামরিক চাপ বাড়াবে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক দেশগুলো এখন আর কোনো বড় যুদ্ধ চায় না। শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নেতৃত্ব ইগো বা জেদ সরিয়ে বাস্তবসম্মত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।