Date: April 26, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি? - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?

April 26, 2026 01:02:26 PM   অনলাইন ডেস্ক
মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?

মুস্তাফিজ শিহাব:
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে রয়েছে বিপুল জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং অন্যদিকে চরম অবমাননা ও পরাজয়ের গ্লানি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে প্রায় ২৪০ থেকে ২৫০ কোটি মুসলমান রয়েছেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ। পৃথিবীর মোট ৫৭টি রাষ্ট্র মুসলমানদের, যা বৈশ্বিক ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ বা পাঁচ ভাগের এক ভাগ জুড়ে বিস্তৃত। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী কাসাব্লাঙ্কা থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এই বিস্তীর্ণ এলাকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর অধীনে। শুধু ভূখণ্ডই নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের বেশ কয়েকটি চাবিকাঠিও মুসলমানদের হাতে। বিশ্বের প্রায় ১৪০টি বড় বড় সমুদ্রবন্দর মুসলিম ভূখণ্ডে অবস্থিত, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক বিশ্বের চালিকাশক্তি যে জ্বালানি তেল, তার প্রায় ৭০ শতাংশই রয়েছে মুসলমানদের আয়ত্ত্বাধীন।

জনশক্তির হিসেবেও মুসলমানরা সামনের সারিতেই পড়বে। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মসজিদ, অসংখ্য মাজার এবং অগণিত আলেম-ওলামা, মুফতি ও গবেষক রয়েছেন। মুসলিম দেশগুলোতে কোটি কোটি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশাল সেনাদল ও পুলিশ বাহিনী রয়েছে। কিন্তু এত বিপুল জনশক্তি, এত সম্পদ এবং এত সামরিক ‘বাহাদুরি’ থাকার পরও বাস্তব চিত্রটি বেশ বেদনাদায়ক। মুসলিম অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিতে এক প্রকার বিষফোঁড়া হয়ে ইসরায়েলের মতো একটি রাষ্ট্র, যার আয়তন মাত্র ২৭ হাজার বর্গমাইল এবং সেখানে ইহুদির সংখ্যা মাত্র ৮০ থেকে ৯০ লাখ (সারা বিশ্ব মিলিয়ে যা বড়জোর ২ কোটির কাছাকাছি হবে), মুসলমানদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মারণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইল অর্থাৎ এক বাক্যে কোনো কিছুতেই মুসলমানরা আজ টিকতে পারছে না। যুদ্ধে যদি পশ্চিমা শক্তির একজন সৈন্য মারা যায়, তবে বিপরীতে শত শত মুসলমান প্রাণ হারাচ্ছে। এই অস্বাভাবিক ও অপমানজনক পরিস্থিতির মূল কারণ কী? এর একটিই কারণ আর তা হচ্ছে মুসলিম এ জাতিটি তার সবথেকে মূখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ‘ঐক্য’ বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে।

প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, ঐক্যবদ্ধ শক্তি সবসময় অনৈক্যের ওপর বিজয়ী হয়। সেখানে সংখ্যা মূল কথা নয়, মূল কথাই হচ্ছে ঐক্য। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে এই অনৈক্যের পরিণাম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে (সুরা আনফাল, আয়াত: ৪৬)।” আজ পৃথিবীব্যাপী তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় গোট মুসলিম বিশ্ব এ স্পষ্ট আদেশ অমান্য করার ফলে আধ্যাত্মিক ভাবে ও প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী চরম অপমান অপদস্তের শিকার হচ্ছে।

তাহলে এখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠে যে আদৌতে কী এই ঐক্য সম্ভব? ইতোমধ্যেই মুসলিম জাতি হাজার হাজার ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল, শিয়া-সুন্নী ইত্যাদি বিভিন্ন মতাদর্শে বিভক্ত। ঐক্যের গুরুত্ব, আলোচনা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের চর্চা সবসময় হলেও তার প্রকৃত প্রয়োগ নিয়ে আমরা স্বাভাবিকভাবেই সন্দিহান। কিন্তু ইতিহাস বলে এ ঐক্য সম্ভব।

প্রাক-ইসলামি আরবের দিকে তাকালে আমরা এক ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। শুষ্ক মরুভূমি আর উত্তপ্ত বালুকারাশির মাঝে বসবাসকারী মানুষদের হৃদয়ও ছিল শুষ্ক ও রুক্ষ। কারণে-অকারণে তারা খুন-খারাবি, হানাহানি, দাঙ্গা ও যুদ্ধে লিপ্ত হতো। গোত্রে গোত্রে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত, মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা ছিল না, নারীদের ন্যূনতম সম্মান ছিল না এবং জুলুম ও নির্যাতন সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল। একদিকে সে মানুষগুলোর ব্যক্তিগত জীবনে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না এবং অপরদিকে তারা ছিল অশিক্ষিত, অবজ্ঞাত ও উপেক্ষিত এক বর্বর জাতি। কিন্তু এই বিভক্ত ও লড়াকু জাতিটির মাঝেই যখন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স.) আবির্ভূত হলেন, তিনি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাদের এমন এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করলেন, যারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে অর্ধ-পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে শ্রেষ্ঠ জাতির আসনে আসীন হয়েছিল। সেই উপেক্ষিত বেদুঈনরাই হয়ে উঠেছিল গোটা বিশ্বের শিক্ষকের জাতি, যারা তৎকালীন দুই পরাশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে একই সাথে সামরিকভাবে পরাজিত করেছিল।

তাহলে কোন মন্ত্রবলে আল্লাহর রসুল (স.) একটি উপক্ষিত জাতিকে সমগ্র বিশ্বের শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিবর্তিত করলেন? এই গোঁড়ার কথাটিই আজ মুসলিম বিশ্ব ভুলতে বসেছে। এই ঐক্যবন্ধনীর মূল যে গিঁট তা আজ মুসলিম জাতির মধ্যে থেকেও নেই। আর এ কারণেই আজ শতধাবিচ্ছিন্ন অবস্থায় এ জাতি সারা বিশ্বজুড়ে মার খাচ্ছে। আল্লাহর রসুল (স.) আরবের সে জাতিটিকে শৃঙ্খলিত ও ঐকবদ্ধ করার জন্য শুধু একটি কথার উপর আহ্বান করেছিলেন। আর সেটি ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”- আল্লাহ ছাড়া আর কোনো হুকুমদাতা নেই। তওহীদের এ শাশ্বত বাক্যের মাধ্যমে তিনি গোটা আরবের সে সকল বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। কারণ তারা সকলেই এক কথায় এই একটি কথাকে মেনে নিয়েছিল যে তারা আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুমের তাবেদারি বা অনুসরণ করবে না। তারা যেখানে আল্লাহর হুকুম রয়েছে সেখানে আল্লাহরটা গ্রহণ করবেন এবং আরবের অবিসংবাদিত নেতা ও আল্লাহর প্রেরিত শেষ রসুল (স.) এর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে একযোগে কাজ করবে। আল্লাহর রসুল (স.) বলেন, “মো’মেনরা একে অপরের জন্য একটি প্রাচীরের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে (সহিহ বুখারি: ৪৮১, সহিহ মুসলিম: ২৫৮৫)।” সুতরাং, ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে যে, চরম বিভক্ত ও বর্বর জাতিকেও ঈমান তথা তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের দিনে সেই ঐক্য কেবল আলোচনা-পর্যালোচনা ও স্লোগানেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সত্যিকারের প্রয়োগ আজও উহ্য।

এছাড়াও মুসলমানদের অনৈক্যের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে, বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের সবচেয়ে বড় কারণ হলো তওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার স্থানটি রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত বিভাজন দখল করে নিয়েছে। এই বিভাজনটি আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ- উভয় ক্ষেত্রেই বেশ প্রকট। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ফাটল হিসেবে শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্বের কথা বলতে হয়। উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালেই দেখা যায় যে, এক মুসলিম দেশের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে, অথচ প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলো নির্বিকার। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক মুসলিম ভূখণ্ডেই বিজাতীয় শক্তির সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখান থেকে তারা অন্য এক মুসলিম জনপদের উপর সকল হামলা পরিচালনা করছে। এ ধরনের আত্মঘাতি ঘটনা আর কোনো জাতির ক্ষেত্রে ইতোপূর্বে হয়েছিল কিনা তা আমার জানা নেই।

অথচ রসুলাল্লাহ (স.) বিদায় হজের ভাষণে এই ভাতৃঘাতী সংঘাতের ব্যাপারে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, “তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান একে অপরের জন্য হারাম (পবিত্র), যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর। আমার মৃত্যুর পর তোমরা একে অন্যকে হত্যা করে কুফরি করো না (সহিহ বুখারি: ১৭৪১, ১৭৩৯)।” কিন্তু রসুলের (স.) সে নির্দেশ আজ শুধুই তাত্ত্বিক।

এছাড়াও অভ্যন্তরীণভাবেও বিভাজনের কারণ বেশ সুষ্পষ্ট। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি সহজেই বুঝা যায়। নির্বাচনের আগে যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ আশা করে যে ধর্মীয় দলগুলো হয়তো ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। কারণ, সামান্য ক্ষমতার লোভ, এমপি-মন্ত্রীর টিকিট বা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে তাদের এ স্বপ্ন কখনো বাস্তবায়িত হয় না। কওমি, আহলে হাদিস, জামায়াত বা বিভিন্ন তরিকতপন্থীরা অর্থাৎ ধর্মভিত্তিকদলগুলো নিজেদের মধ্যকার ক্ষুদ্র মতভেদগুলোকেই সবচেয়ে বড় করে দেখে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে। তারা পশ্চিমাদের বা বৈরী শক্তির চেয়ে নিজেদের মধ্যকার অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনগুলোকেই বেশি ভয় পায় এবং তার কারণ ক্ষমতার লোভ ও নিজেদের স্বার্থোদ্ধার। সত্যিকারঅর্থেই যদি তারা মুসলিম জাতিকে নিয়ে চিন্তা করত তবে তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য এ ধরনের মনোভাবের চর্চা বহু আগেই ত্যাগ করতে পারত।  

ধর্মের নামে রাজনীতি করা বা ক্ষমতার আসনকে আকরে ধরার প্রচণ্ড মানসিকতা মুসলিম জাতির বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মহান আল্লাহ  পবিত্র কোর’আনে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)।” কিন্তু আল্লাহর রজ্জু বা কোর’আনকে বাদ দিয়ে যখন আমাদের ধর্মভিত্তিকদলগুলো দলীয় বা গোষ্ঠীগত রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয়ী হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরাজয়ের গ্লানী নিয়েই আমাদের দিন-অতিবাহিত করতে হয়।

তাহলে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের জন্য এখন কী করণীয়? মুসলিম বিশ্বের এই করুণ দশা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর রসুল (স.) এর সুন্নাহর প্রকৃত অনুসরণ। তিনি যেভাবে বিশৃঙ্খল একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, ঠিক একই নীতি ও কর্মপদ্ধতি (সুন্নাহ) অনুসারে আমাদেরকেও শতধাবিচ্ছিন্ন মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

প্রথমত, দীনের নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি’ বা অতি-বিশ্লেষণ বন্ধ করতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে এবং রসুলাল্লাহ (স.) বিদায় হজের ভাষণে দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রসুল (স.) বলেছেন, “তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি (চরমপন্থা) করো না, কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩০২৯, নাসায়ি: ৩০৫৭)।”

যদি সহজে ‘বাড়াবাড়ি’ বিষয়টি নিয়ে বলতে হয় তবে যতটুকু বলা হয়েছে তার চেয়ে বেশি বিশ্লেষণ করা বা অতি ধার্মিকতা প্রদর্শন করাই মূলত বাড়াবাড়ি। দীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও তর্কে লিপ্ত হওয়াকে রসুল (স.) কুফরির সাথে তুলনা করেছেন কিন্তু সে কাজই গত ১৪০০ বছর ধরে মহা আড়ম্বরতার সাথে হয়ে আসছে। তিনি বলেছেন, “কোরআন নিয়ে বিতর্ক করা কুফরি (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৩)।” এই ‘কুফরি’ করার ফলেই আজ মুসলিম জাতির এ অধঃপতন। তাই এ বিতর্কগুলোকে এখন কবর দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট এক নেতা, আমির বা এমামের নেতৃত্বে আনুগত্য প্রকাশ করে শৃঙ্খলিতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ জাতি হতে হলে নেতৃত্বের প্রতি সম্মান থাকা অপরিহার্য। রসুল (স.) বলেছেন: “যদি কোনো নাক-কান কাটা হাবশি ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমির নিযুক্ত করা হয়, তবে তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো, যতক্ষণ সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করে (সহিহ মুসলিম: ১৮৩৮)।” কিন্তু আজ এ জাতির সকলেই নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্য-বিশ্লেষণে নেতা হয়ে সাধারণ মানুষকে নিজেদের ইচ্ছেমত পরিচালিত করছে এবং নিজস্বার্থ হাসিল করছে। কিন্তু আল্লাহ মনোনীত প্রকৃত নেতা এ জাতির দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য কাজ করবেন এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি অনুসরণ করবেন মহান আল্লাহর বিধান ও রসুলের (স.) কর্মপদ্ধতি।

তৃতীয়ত, ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি হবে তাওহিদ, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, যে পবিত্র বাক্য সকল মো’মেনদের ঐক্যের মূল আধার। উগ্রবাদী, মধ্যপন্থী, সুফিবাদী ইত্যাদি যেসকল পার্থক্য বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে, প্রকৃত ইসলামের দৃষ্টিতে, সেগুলোর কোনো স্থান নেই। যারাই তওহীদের এ অমিয় বাণীকে গ্রহণ করবে ও নিজেদের জীবন ও সম্পদকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবেন তারাই হবেন মো’মেন, সত্যনিষ্ঠ। মো’মেনদের জীবনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে একটিই আর তা হলো আল্লাহ প্রেরিত এ দীনকে অন্য সকল দীনের উপর জয়যুক্ত করা এবং সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। কারণ আল্লাহর দেয়া দীন বা জীবনব্যবস্থা ছাড়া পৃথিবীতে শান্তি আনা অসম্ভব। মানুষের তৈরি আইন কখনোই মানুষকে পরিচালিত করতে সক্ষম নয়, আর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত মানবরচিত তন্ত্র-মন্ত্র।

চতুর্থত, দীন প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে রসুলের (স.) দেয়া কর্মসূচীর অনুসরণ করতে হবে। রসুল (স.) বলেছেন, “আমি তোমাদের পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি যেগুলোর নির্দেশ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন; সেগুলো হলো- জামায়াত (ঐক্যবদ্ধ থাকা), সামআ (শোনা), আত্বাত (আনুগত্য), হিজরত এবং আল্লাহর পথে জিহাদ (সুনানে তিরমিজি: ২৮৬৩, মুসনাদে আহমাদ: ২২৯৫০)।” এ একই কর্মসূচী তখনও বিজয় এনে দিয়েছিল, এখনও এনে দিবে।

তাহলে, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য আজ কেবল একটি আলোচনার বিষয় নয় বরং এটি আজ অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র অবলম্বন। প্রায় আড়াইশ কোটি মুসলমানের এই বিশাল জনগোষ্ঠী আজ একটি নিষ্প্রাণ দেহে পরিণত হয়েছে, কারণ তারা মূল উদ্দেশ্যকেই বাদ দিয়েছে। ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠণের মূলমন্ত্রকে বাদ দিয়েছে এবং আল্লাহর রজ্জু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ সময়কে নির্দেশ করার জন্যই রসুল (স.) ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন: “এক সময় আসবে যখন জাতিগুলো তোমাদের ওপর এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে যেমন ক্ষুধার্তরা খাবারের দস্তরখানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো? তিনি বললেন, “না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অনেক, কিন্তু তোমরা হবে সমুদ্রের কচুরিপানা বা ফেনার মতো অসার (সুনানে আবু দাউদ: ৪২৯৭)।”

অতএব এ লাঞ্ছনার হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের যাবতীয় অনৈক্য বিসর্জন দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সাহায্য ঐক্যবদ্ধ মো’মেনদের ওপর থাকে। তিনি মো’মেনদের ওয়ালী বা অভিভাবক আর তিনিই মো’মেনদের সহায়তা করবেন। এ বিষয়ে রসুল (স.) বলেছেন: “আল্লাহর হাত (সাহায্য) জামায়াতের (ঐক্যবদ্ধ দলের) ওপর থাকে (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৬)।” তাই আমরা যদি আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করে এবং সমস্ত মতভেদ দূরে ঠেলে কেবল তাওহিদের পতাকাতলে সমবেত হতে পারি, তবেই আমাদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, কেবল স্লোগান দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব নয়।