


নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি:
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় নামখারিজ বাতিলের একটি আবেদনে সরেজমিন তদন্ত করতে গিয়ে অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে পক্ষপাতমূলক ও ভুয়া প্রতিবেদন দাখিলের অভিযোগ উঠেছে এক ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার নাম সেলিনা পারভীন। তিনি উপজেলার নয়াবিল ও রামচন্দ্রকুড়া মন্ডলিয়াপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন।
জানা যায়, উপজেলার নাকুগাঁও মৌজায় নাকুগাঁও স্থলবন্দর এলাকায় ৫১৬ নম্বর দাগে ডেপুটি কমিশনারের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং ‘বাড়ি’ শ্রেণিভুক্ত ৩ একর ১৩ শতক খাসজমি রয়েছে। জমিটিতে আগে স্থানীয় ভূমিহীনদের বসতবাড়ি থাকলেও প্রায় ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির ভোগদখলে তা স্থলবন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মধ্যে ভূমিহীন হাবেজ উদ্দিনের ভোগদখলে থাকা ২০ শতক জমি চুক্তিভিত্তিক ভাড়া নিয়ে তৌহিদুল আলমের মালিকানাধীন ‘নিলয় এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সেমিপাকা ও টিনশেড অফিস করে কয়লা এবং পাথর আমদানির ডিপো হিসেবে ব্যবহার করছে।
সম্প্রতি একই জমি নিজেদের দখলে নিতে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা জামাল উদ্দিন ১৯৯০ সালে করা একটি কবুলিয়তনামা বন্দোবস্ত দলিল উত্থাপন করেন। ওই জমি দখলে নিতে তিনি অভিযুক্ত ভূমি কর্মকর্তা সেলিনা পারভীনের দ্বারস্থ হলে, সেলিনা পারভীন সেখানে পতাকা টানিয়ে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বর্তমান ভোগদখলদারদের বাধার মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পরবর্তীতে জামাল উদ্দিনের ওই বন্দোবস্ত দলিলটি সঠিক কি না, তা যাচাই করতে গিয়ে শেরপুর জেলা মহাফেজখানার (রেকর্ড রুম) তল্লাশিকারক রেজুয়ান হোসেন দলিলের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। এ অবস্থায় ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে জামাল উদ্দিনের নামে হওয়া জমির নামখারিজ বাতিলের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করেন বর্তমান ভোগদখলকারী হাবেজ উদ্দিন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিসুর রহমান জমির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন তলব করেন ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা সেলিনা পারভীনের কাছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেলিনা পারভীন সরেজমিন তদন্তে না গিয়ে জামাল উদ্দিনের সঙ্গে যোগসাজশ করে একটি ভুয়া প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তিনি জমিটি ডেপুটি কমিশনারের নামে রেকর্ডভুক্ত উল্লেখ করলেও বর্তমান বাস্তব অবস্থা আড়াল করে লেখেন, ‘জমিটি বাদী বা বিবাদী কারও দখলেই নেই এবং আগে তা জামাল উদ্দিনের দখলে ছিল।’
বর্তমান দখলদার হাবেজ উদ্দিন, নিলয় এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপকসহ আশপাশের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, উল্লেখিত জমিটি স্বাধীনতার পর থেকেই হাবেজ উদ্দিনের ভোগদখলে ছিল। নাকুগাঁও স্থলবন্দর ঘোষণার পর তিনি তাঁর বাড়ি সরিয়ে নেন এবং জমিটি ডিপো হিসেবে নিলয় এন্টারপ্রাইজকে ভাড়া দিয়ে সেই টাকায় সংসার চালাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, জামাল উদ্দিনকে ওই জমি পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের অনৈতিক লেনদেন করে সত্য আড়াল করেছেন ভূমি কর্মকর্তা সেলিনা পারভীন।
এ বিষয়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, "খাস ওই জমিটি দীর্ঘদিন ধরেই হাবেজ উদ্দিনের ভোগদখলে ছিল, যা তিনি নিলয় এন্টারপ্রাইজকে ডিপো হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দিয়েছেন। এ জমি কখনোই জামাল উদ্দিনের দখলে ছিল না।"
এদিকে নিজের নামে থাকা বন্দোবস্ত দলিল সঠিক দাবি করলেও অভিযুক্ত জামাল উদ্দিন বলেন, "ওই জমিটি বর্তমানে নিলয় এন্টারপ্রাইজের দখলে রয়েছে, আমার দখলে নেই। সরকারিভাবে জমি পেলে যাব, নইলে যাব না।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা সেলিনা পারভীন প্রথমে দাবি করেন, ওই জমি বাদী বা বিবাদী কারও দখলেই নেই। তবে তাঁর এই মতামতের চ্যালেঞ্জ করা হলে তিনি সুর পাল্টে বলেন, "সেখানে গিয়ে দেখে বলতে হবে।" একপর্যায়ে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সার্বিক বিষয়ে নালিতাবাড়ীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিসুর রহমান বলেন, "এ নিয়ে মিসকেস (মিসেলেনিয়াস কেস) দায়ের করা হয়েছে। তবে এখনো শুনানি হয়নি। শুনানির সময় প্রতিবেদন ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে নিজ কার্যালয়ের চেয়ারে বসে এই ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা সেলিনা পারভীনের আর্থিক লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সে সময় তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করা হয়। তবে তিনি দাবি করেছিলেন যে ওই অর্থ ঘুষের ছিল না।