


শাহাদৎ হোসেন:
রাজধানীতে হেযবুত তওহীদের আয়োজনে ‘মানবাধিকার ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতে আমাদের প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকাল ১০টায় রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে এই আলোচনা সভা করা হয়। সভায় বক্তারা বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা ও বাংলাদেশের চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য তওহীদ ভিত্তিক জীবনব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেন।
হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুব আলম মাহফুজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান। কেন্দ্রীয় গণমাধ্যম যোগাযোগ সম্পাদক শারমিন সুলতানা চৈতির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস.এম. সামসুল হুদা, ঢাকা কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ উদ্দিন রাব্বানি প্রমুখ। বৈঠকে সাব এডিটরস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম, দেশ রূপান্তরের সিনিয়র সাব-এডিটর জাফরুল আলম, সিনিয়র সাংবাদিক মীর আফরোজ জামান, সাপ্তাহিক সুবানীর সম্পাদক আইয়ুব রানা, চ্যানেল এস’র সিটি এডিটর শামীম হোসাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও সুধীজনরা মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে মশিউর রহমান দেশের বর্তমান মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সব জায়গায় ঘুরেছি, সব শ্রেণির মানুষের সাথে কথা বলেছি। আমি সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছি, ভাই আপনারা কি আপনাদের জীবনে কখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার দেখেছেন? অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, আমাকে কেউ বলতে পারেনি যে তারা তাদের জীবনে ন্যায়বিচার দেখেছে। ন্যায়বিচার শব্দটি এখন কেবল ডিকশনারিতেই টিকে আছে, বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ তরুণ প্রজন্ম দেখছে কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা আজ শূন্যের কোঠায়। আমি মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছি, আপনার ঘরে যে মা, বোন বা সন্তান আছে, আপনি কি তাদের ইজ্জতের গ্যারান্টি দিতে পারবেন? কেউ আমাকে সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। আমরা আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যে, এখানে বেঁচে থাকার গ্যারান্টিই কেউ দিতে পারে না। আমরা রাজবাড়ীতে দেখেছি, এমনকি মৃত মানুষের লাশেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। মিরপুরে কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৩ জন নারী লাঞ্ছিত হয়েছেন। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে কেবল হত্যা আর খুনের খবর আসছে। এই যদি হয় দেশের চিত্র, তবে বাক স্বাধীনতা বা মানবাধিকার কোথায়?
মশিউর রহমান বাক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে বলেন, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু আছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো হেযবুত তওহীদ। কেবল আমাদের মতাদর্শ প্রচারের কারণে আমাদের মাননীয় এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের বাড়ি এ পর্যন্ত চারবার আক্রান্ত হয়েছে। দুইবার তার বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দুইজন সদস্যকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে। দুঃখের বিষয় হলো, সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো লক্ষণ আজ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি না, বরং একে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মানবাধিকারের সংজ্ঞা আমরা কেবল বইয়েই পড়ি, বাস্তব জীবনে এর কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখিনি।
বিদ্যমান ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমান যে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে, এই কাঠামোতে কখনো মানুষের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি সম্ভব নয়। আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমলের তৈরি যে রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু আছে, তা তৈরিই করা হয়েছিল এ দেশের সম্পদ লুট করার জন্য এবং প্রতিবাদীদের দমন করার জন্য। ব্রিটিশরা চলে গেলেও আমরা সেই একই সিস্টেম ধরে রেখেছি। ফলে ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও ফল একই আসছে। যেমন একটি মদের কারখানা থেকে কেবল মদই বের হবে, সেখানে শ্রমিক পরিবর্তন করে কোনো লাভ নেই। ঠিক তেমনি এই লুটেরা সিস্টেম বহাল রেখে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব নয়। আমরা ধর্মীয়ভাবেও বিশ্বাস করি, স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা ছাড়া মুক্তি অসম্ভব। যে বিচার ব্যবস্থা বা অর্থনীতি স্রষ্টার হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক, তা মানলে আমাদের ঈমান থাকে না। ১৫০০ বছর আগে আরবের অন্ধকার যুগে আল্লাহর রসূল যেভাবে আইয়ামে জাহেলিয়াত দূর করে এক শান্তিময় সমাজ গড়েছিলেন, আজও সেই তওহীদ ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই আমাদের মুক্তি দিতে পারে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এস.এম. সামসুল হুদা বলেন, বর্তমান বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে আমরা দেখছি যুদ্ধ, রক্তপাত ও আগ্রাসনের মাধ্যমে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলছে। বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের ভয়াবহ মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা বারবার দেখেছি দেশে আন্দোলন হয়, সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও মৌলিক মানবাধিকার আজও নিশ্চিত হয়নি। মানুষ তার মনের কথা বলতে ভয় পায়, বাক স্বাধীনতা রক্ষাতে আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি।
তিনি দেশের সাম্প্রতিক কিছু সহিংসতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভিন্নমতের মানুষেরা আমাদের দেশে এখনো নিরাপদ নয়। কুষ্টিয়ায় পীরের দরগায় হামলা করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, গাজীপুরের কাপাসিয়ায় হেযবুত তওহীদকে এলাকা থেকে উচ্ছেদ করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এমনকি বরিশালে বিএম কলেজে হেযবুত তওহীদ ছাত্রফোরামের ছাত্রদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী আজ ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে। তারা আইনের তোয়াক্কা করছে না।
সামসুল হুদা আরও বলেন, প্রচলিত শাসনব্যবস্থায় বারবার পরিবর্তন আনা হলেও তা সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর প্রধান কারণ বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তির সীমাবদ্ধতা। মানুষের তৈরি করা কোনো বিধান দিয়ে মানুষের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি অসম্ভব। এই ঘোরতর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য হেযবুত তওহীদের এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের দেওয়া প্রস্তাবনা অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া তওহীদের ভিত্তিতে একটি শান্তিময় জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। কেবল এই আদর্শই পারে সব ধরনের ফ্যাসিবাদ নির্মূল করে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, অনেক আলেমদের সাথে আমাদের মিল নেই বলে আমাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমাদের পয়েন্ট খুব পরিষ্কার। আমরা কোরআনের মূল বিধানকে এক নম্বরে রাখি। নামাজ, রোজা, হজ যেমন ফরজ, তেমনি কোরআনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানগুলোও ফরজ। অথচ আজ নফল, সুন্নাহ বা মাসলা-মাসায়েল নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি করে মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। আজ ২৪০ কোটি মুসলমান থাকার পরও আমরা ছোট রাষ্ট্র ইসরায়েলের হাতে মার খাচ্ছি কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি।
তিনি বলেন, ইসলাম এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য, কিন্তু আজ একে ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। আল্লাহ কোরআনের সূরা বাকারার ১৭৪-১৭৬ নম্বর আয়াতে এবং সূরা ইয়াসিনের ২১ নম্বর আয়াতে ধর্মের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ বা বিনিময় চাওয়া হারাম করেছেন। আমরা যখনই এই ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বলেছি, তখনই আমরা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর টার্গেটে পড়েছি। তারা আমাদের ইহুদি-খ্রিস্টানদের দালাল বা মোসাদের এজেন্ট বলে মিথ্যা অপবাদ দেয়। তারা ধর্মের নামে মিথ্যা ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয় এবং মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করে।
সাংবাদিকদের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, আপনারা সমাজের দর্পণ। আমাদের ওপর যখন হামলা হয়, তখন অনেক সময় মিডিয়ায় আসে ‘গ্রামবাসীর সাথে সংঘর্ষ’। এটা অত্যন্ত ভুল তথ্য। গ্রামবাসী আমাদের ভাই, আমরা তাদের সাথে মিলেমিশে থাকি। হামলা করে মুষ্টিমেয় কিছু ভাড়াটে উগ্রবাদী মোল্লা গোষ্ঠী। আপনারা যদি এই উগ্রবাদীদের চিহ্নিত না করে ঢালাওভাবে গ্রামবাসীকে দায়ী করেন, তবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ হয় না। কাপাসিয়ায় একজন বহিরাগত ইমামকে এনে আমাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা যখন আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি, তারা তখন মিথ্যা প্রচার চালিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলার পরিকল্পনা করেছে। এই উগ্রবাদীদের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরা আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ডা. মাহফুজ ইসলামের জিহাদ ও সন্ত্রাসের পার্থক্য পরিষ্কার করে বলেন, ইসলামে জিহাদ বা যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। যুদ্ধ করার অধিকার কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বা সরকারের আছে, কোনো ব্যক্তির বা দলের নয়। আজ যারা ‘তৌহিদী জনতা’র নামে মাজার ভাঙছে বা মানুষের ওপর হামলা করছে, তারা আসলে ‘ফাসাদ’ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। আল্লাহ ফেতনা-ফাসাদকে হত্যার চেয়েও জঘন্য বলেছেন। এই উগ্রবাদীদের কারণে আজ বিশ্বজুড়ে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তারা কোরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপথগামী করছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশ আজ ভূ-রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, তবে আমাদের অবস্থাও ফিলিস্তিনের মতো হতে পারে। ধর্মকে বাদ দিয়ে নয়, বরং ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দিয়েই শান্তি আনতে হবে। ইউরোপীয়রা যদি কয়েক হাজার বছর আগের রোমান আইন বা হাম্বুরাবির আইনকে তাদের বর্তমান আইনি ব্যবস্থার উৎস ধরতে পারে, তবে আমরা কেন ১৪০০ বছর আগের সেই গ্লোরিয়াস ইসলামি সভ্যতা ও কোরআনের বিধানকে আমাদের আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারব না? দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের প্রস্তাবনাগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করার জন্য তিনি সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
সাংবাদিক, বিশিষ্টজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই গোলটেবিল সভাটি একপর্যায়ে একটি প্রাণবন্ত উন্মুক্ত আলোচনায় পরিণত হয়। উপস্থিত সুধীজনরা দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে হেযবুত তওহীদের এমন সাহসী ও সময়োপযোগী প্রস্তাবনার প্রশংসা করেন এবং এ নিয়ে বিশদ পর্যালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আলোচনার ইতি টেনে আমন্ত্রিত অতিথিরা বলেন, সমাজ থেকে উগ্রবাদ নির্মূল করে মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের গঠনমূলক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের এমন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।