Date: April 19, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান: আসুন দীন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান: আসুন দীন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি

March 25, 2026 03:38:33 PM   অনলাইন ডেস্ক
আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান: আসুন দীন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি

এস এম সামসুল হুদা:
সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। ঈদ মোবারক! অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে আমরা এক উদাত্ত আহ্বান নিয়ে এসেছি। আজ ভয়াবহ অশান্তির লেলিহান আগুনে জ্বলছে সমগ্র বিশ্বমানবতা। কোথাও শান্তির লেশমাত্র নেই। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম ও বর্বরোচিত মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে।

বিশ্বের বর্তমান মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ২০০ কোটি মুসলমান আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। সংখ্যায় এত বিশাল হওয়া সত্ত্বেও যখন ফিলিস্তিনকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া হয় তখন আমরা কার্যকর কিছুই করতে পারি না। মিয়ানমারের লক্ষ লক্ষ মুসলমান এখনো বাস্তুচ্যুত ও উদ্বাস্তু, তাদের ন্যূনতম মানবাধিকারটুকুও নেই। ইরানের অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের তাণ্ডব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। বিশ্বের অন্যত্রও মুসলিম জাতির লাঞ্ছনা ও কষ্টের কোনো শেষ নেই।

অন্যদিকে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু একের পর এক দাবি আদায়ের আন্দোলন, হরতাল, রাজনীতি, অপরাজনীতি এবং হামলা-পাল্টা হামলার এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি জাতিটাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশ বিদেশিদের কাছে ২৩ লক্ষ কোটি টাকার উপরে ঋণে জর্জরিত (সূত্র: বিবিসি)। অর্থাৎ, পুরো দেশটাই আজ ঋণের জালে বন্দী। এর আগে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দেয়।

সেসময় সংস্কারের বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছি। আমরা বলেছি, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের তৈরি। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের তৈরি করা এই ভ্রান্ত ব্যবস্থা বজায় রেখে দুর্নীতি ও অর্থপাচার বন্ধ হবে না, বিচার বিভাগের জুলুম শেষ হবে না এবং অর্থনীতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। শান্তি ও মুক্তি পেতে হলে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আধুনিক যুগের বাস্তবতার নিরিখে কীভাবে আল্লাহর দীন তথা কোর’আনের বিধান রাষ্ট্রজুড়ে কার্যকর ও প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা সম্বলিত প্রস্তাবনা আমরা সরকারের কাছে পেশ করেছি।

আমাদের এই প্রস্তাবনার শিরোনাম- “তওহীদভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।” সরকারের পাশাপাশি আমরা রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত জেলার প্রেসক্লাবে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এই রূপরেখা তুলে ধরেছি। এছাড়া অনলাইন ও অফলাইনে বিরামহীনভাবে বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরছি।

আমাদের দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে রেখে যাওয়া এবং ইহুদি-খ্রিষ্টান সভ্যতার তৈরি আইন-কানুন ও ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের নামে মানবরচিত তন্ত্র-মন্ত্র আর রাজনৈতিক দলাদলির বেড়াজালে তারা আটকে আছে। তাদের মন-মগজ থেকে এ ধারণাটিই হারিয়ে গেছে যে, একজন মুসলমান ঈমান আনার পর তাকে একমাত্র আল্লাহর আইন ও বিধান দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করতে হয়। দুঃখজনকভাবে, আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনগুলো আজ বিভিন্ন ফেরকা ও দলে বিভক্ত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। ফলে দীন প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে।

এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, অনেক তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। কিন্তু সামনে আরও ভয়ানক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। তাই সম্মানিত আলেমদের প্রতি আমার আকুল আবেদন- আপনারা কোর’আন-হাদিসের জ্ঞানে পারদর্শী, আপনারা শরীয়তের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাসয়ালা-মাসায়েল নিয়েও গবেষণা করেন। আপনারা জানেন, ইসলামের ভিত্তি হলো ‘তওহীদ’ বা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ (সা.)’ অর্থাৎ আল্লাহর বিধান ছাড়া আর কারও হুকুম-বিধান না মানা। পবিত্র কোর’আনে প্রদত্ত মো’মেনের সংজ্ঞায় আল্লাহ ও তাঁর রসুলের  (সা.) প্রতি ঈমান আনার পরপরই জান-মাল দিয়ে জিহাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে (সুরা হুজরাত ১৫)। এই জিহাদ হলো দীন প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। নবী করীম (সা.)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি আজীবন শিরক, কুফর ও গাইরুল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ করেছেন।

আজ আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ, সম্মানিত খতিব ও ইমাম সাহেবগণ আছেন। হাজার হাজার মাদ্রাসার মুহতামিম ও শিক্ষকবৃন্দ দীনের এলেম শিক্ষা দিচ্ছেন। অসংখ্য বক্তা, ওয়ায়েজ ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দীনের দাওয়াত দিচ্ছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো- আমাদের রাষ্ট্র চলে ব্রিটিশের তৈরি আইনে, বিচার চলে তাগুতের বিধানে। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা আল্লাহর বিধান অনুসরণ করতে পারছি না, সেক্ষেত্রে আমাদের ঈমানের দাবিও পূরণ হচ্ছে না।

আমরা ‘হেযবুত তওহীদ’ আন্দোলন এ বার্তাটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি যে, বর্তমান অকার্যকর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ইত্যাদি ব্যবস্থা বাদ দিয়ে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই লক্ষ্যেই আমরা একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছি। আমাদের আন্দোলনের পাঁচ দফা কর্মসূচিও সরাসরি শেষনবীর (সা.) একটি হাদিস থেকে গৃহিত প্রকারান্তরে আল্লাহ প্রদত্ত। রসুল (সা.) সমগ্র জীবন এই কর্মসূচি অনুসারে সংগ্রাম করে গেছেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তিনি তাঁর নিজ হাতে গড়ে তোলা উম্মাহর উপরে এই কর্মসূচি অনুযায়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। তিনি বলেন- ‘আল্লাহ আমাকে পাঁচটি কাজের আদেশ দিয়েছেন। আমি তোমাদেরকে সেই পাঁচটি কাজের আদেশ দিচ্ছি। সেগুলো হচ্ছে-  
১. আল্লাহর তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
২. নেতার আদেশ শোনা (শৃঙ্খলা)।
৩. নেতার আদেশ পালন করা (আনুগত্য)।
৪. যাবতীয় শিরক ও কুফরের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করা (হিজরত)।
৫. এই দীনুল হক (সত্য জীবনব্যবস্থা) পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো (জেহাদ)।

যে ব্যক্তি (কর্মসূচির) এই ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও বহির্গত হল, সে নিশ্চয় তার গলদেশ থেকে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলল- যদি না সে আবার তওবা করে ফিরে আসে এবং যে ব্যক্তি অজ্ঞানতার যুগের কোনো কিছুর দিকে আহ্বান করলো, সে নিজেকে মুসলিম বলে বিশ্বাস করলেও, নামাজ পড়লেও এবং রোজা রাখলেও নিশ্চয়ই সে জাহান্নামের জ্বালানি পাথর হবে [আল হারিস আল আশয়ারী (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাব উল এমারাত, মেশকাত]।

এই কর্মসূচির আলোকেই আমরা বিরামহীন সংগ্রাম করে যাচ্ছি। আমরা মনে করি, সাধারণ জনগণের চেয়ে এই গুরুদায়িত্ব আলেম সমাজের ওপরই বেশি বর্তায়। কারণ, সাধারণ মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে আলেমদের মুখাপেক্ষী। ইসলামের কোনো প্রসঙ্গ উঠলে তারা তাকিয়ে থাকে- আলেমরা কী বলেন। তাই আলেমদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। আপনারা  মসজিদের মিম্বরে বসে, ওয়াজ মাহফিলে কিংবা মাদ্রাসায় বসে দীনের এলেম প্রদান করেন। তাই এ মুহূর্তে আপনাদেরই দায়িত্ব হলো জনগণকে বোঝানো যে, মানুষের তৈরি এই ব্যর্থ ও অকার্যকর জীবনব্যবস্থা ত্যাগ করে আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রসুলাল্লাহ (সা.) যেভাবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, সেভাবে তওহীদের ভিত্তিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এক আপোষহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। যেই সংগ্রামে দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ থাকবে না, থাকবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি- তবেই আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।

সম্মানিত আলেম সমাজ, শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজে এক ফেরকার সঙ্গে আরেক ফেরকার মাসলা-মাসায়েল ও আকিদাগত বিরোধ চলে আসছে। তুচ্ছ ও নগণ্য বিষয় নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা এবং ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আল্লাহর কাক্সিক্ষত ঐক্যের বদলে অনৈক্য, ভ্রাতৃত্বের বদলে শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম সমাজের সামষ্টিক শক্তি ভেঙে পড়েছে এবং দীন প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরে গেছে। এই সুযোগটাই ইসলামবিরোধী শক্তিগুলো নানাভাবে কাজে লাগাচ্ছে। তারা মুসলিমদের পারস্পরিক সংঘর্ষকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং বিভেদের আগুনকে প্রজ্বলিত করছে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করার কারণে আমাদের মূল্যবান সময়, শ্রম ও অর্থ শুধু অপচয়ই হয়নি, বরং মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়েছে। তাই আমরা মনে করি, লক্ষ লক্ষ ইসলামপ্রেমী, দীন-প্রতিষ্ঠাকামী আলেম-ওলামার জ্ঞান, শ্রম ও অর্থকে একত্র করে একটি নির্দিষ্ট ও সঠিক লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। হেযবুত তওহীদ আন্দোলন এই মহান লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। আপনাদের প্রতি আমাদের বিশেষ কিছু আবেদন রয়েছে:

প্রথমত: আপনারা অন্তত ইসলামের প্রকৃত সত্যের পক্ষে দুটি কথা বলুন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আলেমদের মধ্যে একটি শ্রেণি পরিকল্পিতভাবে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে অহেতুক জঘন্য অপপ্রচার চালিয়েছে। আমরা যা বলিনি, তা আমাদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ আমরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হুকুমত তথা দীনুল হক প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তাই আমরা আহ্বান জানাই, কারো অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষ মন দিয়ে আমাদের প্রকাশনা পড়ুন। আমাদের সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা নিন এবং আমরা কী বলতে চাই তা জানুন। হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে যারা অপপ্রচার চালায়, তাদের কথাগুলো যাচাই করুন এবং এর সমুচিত জবাব দিন।

দ্বিতীয়ত: জনগণকে আল্লাহর নিরঙ্কুশ তওহীদের দিকে উদ্বুদ্ধ করুন। তাদেরকে বোঝান যে, আল্লাহর আইন-বিধান ছাড়া মানুষের তৈরি আইনে শান্তি আসতে পারে না।

তৃতীয়ত: মসজিদের মিম্বর, ওয়াজ মাহফিল, মাদ্রাসা, খানকায় অর্থাৎ যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, অনলাইনে অফলাইনে বর্তমান ব্যবস্থার অসারতা ও ব্যর্থতা তুলে ধরুন এবং আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থার পক্ষে জনমত গড়ে তুলুন। তওহীদের অর্থ, ঐক্যের গুরুত্ব, জেহাদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য, দীন কায়েমের প্রয়োজনীয়তা মানুষের সামনে উপস্থাপন করুন।

আসুন, সকল ভেদাভেদ ভুলে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হই। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

[লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ। যোগাযোগ: ০১৬৭০-১৭৪ ৬৫১]