Date: April 17, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / পহেলা বৈশাখের সেকাল-একাল; বিবর্তনের ধারাবাহিকতা - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

পহেলা বৈশাখের সেকাল-একাল; বিবর্তনের ধারাবাহিকতা

April 15, 2026 10:09:22 PM   অনলাইন ডেস্ক
পহেলা বৈশাখের সেকাল-একাল; বিবর্তনের ধারাবাহিকতা

ওবায়দুল হক বাদল:
কোট- এই উৎসবকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ অপচয় হয়, অপব্যয় হয় এই অপচয় রোধ করে এই অর্থ যদি গরিব-দুঃখী মানুষের কাজে আসত তাহলে নবান্ন উৎসব বলেন আর পহেলা বৈশাখ বলেন তা হারাম নয় বরং ইবাদত হিসেবে কবুল হতো।

প্রত্যেক বছর পহেলা বৈশাখ আসলেই একটা ‘কেত্তন’ শুরু হয়! একটি শ্রেণি মঙ্গল শোভাযাত্রা করে আসমান থেকে যেন মঙ্গল নামিয়ে আনবে। আরেকটা শ্রেণি শুরু করে দেয় এটা হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি, এসব হারাম, বেদাত ইত্যাদি ইত্যাদি। এই দুই শ্রেণির চেতনার দ্বন্দ্ব মৌসুমী যুদ্ধে রূপ নেয় এই সময়টায়। দু’দলই নাচুনি বুড়ি। এদের নাচাতে বৈশাখ এসে যেন ঢোলে বাড়ি মারে প্রতিবছর।

নাম নিয়ে রাজনীতি
‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে একটি কৃত্রিম কার্যকলাপ বাঙালি সংস্কৃতি পহেলা বৈশাখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত, এই কৃত্রিম উদ্ভাবিত মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে পহেলা বৈশাখের কোনো সম্পর্ক নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রা হলো পয়লা বৈশাখের বেদাত -এমন আপত্তি তুলে হাইকোর্টে রিটও করতে দেখা গেছে ইতোপূর্বে।

ছাত্রজনতার গণঅভ্যূত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সেই মঙ্গলকে বিদায় জানিয়ে এই শোভাযাত্রার নাম দেওয়া হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। বিএনপি সরকার গঠনের পর আনন্দও আর সার্ভাইভ করতে পারেনি। বর্তমান সরকার অনেকটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সকল শ্রেণির চেতনাধারীদের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে এর নামকরণ করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। তাতেও বিতর্ক থামেনি। শব্দের উৎপত্তিস্থান তুলে ধরে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামকরণকে জেন্ডার চেঞ্জ বলে অভিযোগ করতে ছাড়েননি অনেকে।

পরবর্তীতে ইসলামপন্থী কোনো দল আসলে এর নাম হয়ত ‘ইনকিলাবী শোভাযাত্রা’ টাইপ কিছু হবে -এমন ধারণা অনেকের। আর বর্ষবরণেই যাদের আপত্তি তারা ক্ষমতায় আসলে হয়ত এর নাম বেদাতী শোভাযাত্রাও হতে পারে।

এদিকে ধর্মীয় একটি শ্রেণি তো তাদের অবস্থানে এখনো অনড়। নাম যাই হোক না কেন পহেলা বৈশাখ উদযাপন তাদের কাছে হারাম। তাদের মূল প্রতিপক্ষ সেক্যুলার গোষ্ঠীটিও কম যায় না। সাম্প্রদায়িক পিশাচ আখ্যা দিয়ে তারা এই শোভাযাত্রাকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। ভাবভঙ্গি এমন যেন, প্রয়োজনে শহীদ হবে কিন্তু এখানে ছাড় দিবেন না।

অনেকে মনে করে থাকেন পহেলা বৈশাখ হিন্দুয়ানি কালচার। ইন্ডিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে এই কালচার। কিন্তু আমার তা মনে অয় না। কারণ এর সূচনা বাংলাদেশেই। যদিও বাংলা নববর্ষ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা বলে কিছুর অস্তিত্ব পূর্বে ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার শুরু হয়। পরবর্তীতে এর নাম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। পরে ২০১৭ সালে প্রথম কলকাতায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা আসলে রপ্তানি হয়েছে আমদানি নয়। তবে আইডিয়াটা দেশি বুদ্ধিজীবী আর পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা মিলেই উৎপাদন করেছেন বলে অনেকের ধারণা।

পয়লা বৈশাখ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি করতে দ্যাখা যায় যে শ্রেণিটিকে তাদেরকে সারা বছর রেস্টুরেন্টে ঘুরে ঘুরে বার্গার, পিজ্জা আর হটডগ খেতে দেখা যায়। বাঙালি পোশাকের থেকে পশ্চিমা পোশাক পরতেই তারা বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করেন। এই একটা দিন বাঙ্গালি পোশাক পরে, মাটির থালায় শুকনা মরিচ দিয়ে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য তারা পাগল হয়ে যান। তাদের এই একদিনের আবেগকে বক বাঙ্গালিয়ানা ছাড়া কি বলা যায়! একদিনের জন্য তারা ভীষণ বাঙ্গালি হয়ে ওঠেন। এদের ভক্তি সকালে শুরু হয় দিন শেষে সূর্যের সাথে ভক্তিও ডুবে যায়।  

আবার অনেকে আছেন পহেলা বৈশাখ বন্ধে পারলে জেহাদ ঘোষণা করেন। পয়লা বৈশাখ বন্ধ করতে শহীদ পর্যন্ত হতে রাজি কিন্তু হিজরি কোন সাল চলে তিনি জানেন না।

কর্পোরেট বাণিজ্যের কবলে পহেলা বৈশাখ
পহেলা বৈশাখের ইঞ্জিনে তেল সরবরাহ করে আবার ব্যবসায়ীরা! একে একেবারে কর্পোরেট লুক দিয়ে ছেড়েছেন তারা। দিবেন না বা কেন! ভালো মৌসুম তাদের জন্য! তারা নানাভাবে প্রভাবিত করতে থাকল জাতিকে; বৈশাখী কোর্তা পরো রে, পান্তা-ইলিশ খাও রে, এটা করো রে, ওটা করো রে।

যখনই এটা জাতির অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল তখনি ৩০০ টাকার ওয়ান টাইম শাড়ির দাম ১০০০ টাকা হয়ে গেল। ১০ টাকার ফুল ৫০ টাকা। ইলিশের মতো দেখতে সার্ডিন মাছ, চৌক্কা মাছ বিক্রি হতে শুরু করল ২২ ক্যারেটের মূল্যমানে। আর নদীর জাটকা বিক্রি হলো ২৪ ক্যারেটের মূল্যমানে। ৫০০ টাকার ইলিশের দাম হয়ে গেল ৫০০০ টাকা পর্যন্ত।

উৎসবীদের একটি শ্রেণির পহেলা বৈশাখের বাজেট থাকে লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ভীষণ বাঙ্গালি এরা! অথচ বাংলা কত সন চলে -এমন প্রশ্নে তাদের অনেকের চেহারা মোবারক চুপসে যায়! অনেকে ঠিক মতো বাংলা ১২ মাসের নামও বলতে পারেন না? ৬ ঋতুর নামও সিরিয়ালি বলতে পারেন না। গ্রীষ্ম, বর্ষা বলার পর আষাঢ়, শ্রাবণ বলতে শুরু করেন। ঋতুর নামের মধ্যে মাসের নাম ঢুকে যায়।

পহেলা বৈশাখ নিয়ে এমন হৈ-হুল্লোর আগে ছিল?
মুরব্বিদের ভাষ্যমতে, পহেলা বৈশাখ নিয়ে এত ক্যাচাল আগে ছিল না। আর এমনও নয় যে, হাজার বছর ধরে এটা চলে আসছে। এমনকি পান্তা-ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতিও ছিল না। তাহলে এসব ঢুকল কিভাবে?

অনেক বিশ্লেকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ আর এইবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা মিলে এটাকে নিয়ে যায় শোভাযাত্রায়, মঙ্গলে। সেই থেকেই ক্যাচালের শুরু। এরপর সুযোগ বুঝে এর মধ্যে টুপ করে ঢুকে পড়ে হুলুডুলিয়া। যেকোনো জিনিস এভাবেই বিকৃত হয়।

এক পর্যায়ে ফতোয়ার কিতাব নিয়ে হাজির হন এক শ্রেণির আলেম-ওলামারা। এটা হাদিসে নাই, কোরআনে নাই, বেদাত এটা-সেটা কত কি! এসব করলে ঈমান থাকবে না। হারাম হারাম হারাম! এবার আলেম ওলামাদের বিরুদ্ধে সিনা টান করে দাঁড়ায় সেই সেক্যুলার মাইন্ডের বুদ্ধিজীবীরা।

WhatsApp Image 2026-04-15 at 10.05.34 PM

কথা হলো বর্ষবরণ নিয়ে এত রাজনীতি করার কি দরকার ছিল? আগে তো পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে আলেম ওলামাদের ফতোয়াবাজি করতে দেখা যায়নি। তারাতো আগে বাধ সাধেনি। নাকি ধর্মীয় উৎসব ঈদ-পুঁজার বিকল্প হিসেবে এই উৎসবকে তারা নিজেদের মতো করে নিয়েছেন? তাদের ভাবভঙ্গি দেখলে এমন প্রশ্ন ওঠাও অবান্তর নয়।  

আরেকটা প্রশ্ন থেকেই যায়, শোভাযাত্রা যদি বন্ধ হয় তাহলে চারুকলার ছাত্রদের কি হবে? ৫-৬ বছর পড়াশোনা করে বের হয়ে এরা খাবে কি করে? কজন ভাষ্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি বানানোর অর্ডার পান? আর তাদের শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষেত্রও তো কমে যায়! তাও বছরের একটা দিন তারা তাদের উপস্থিতির জানান দেয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ হলে এদের অস্তিত্ব সংকটে পরার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাইলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো, আধুনিক বাংলা বর্ষবরণ উৎসব কি চারুকলার ছাত্রছাত্রীদের অস্তিত্বের লড়াই? নাকি কথিত অসাম্প্রদায়িক ও সাম্প্রদায়িকদের ইগোর লড়াই? নাকি ভারতপন্থী বা ভারতবিরোধী রাজনীতির সংস্কৃতির মঞ্চ?

WhatsApp Image 2026-04-15 at 10.05.35 PM
 

কেমন ছিল সেকালের পহেলা বৈশাখ
আগের নববর্ষ উদযাপন এখনকার মতো ছিল না। সেটা সত্যিই প্রাণের উৎসব ছিল। সেদিনের রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং-ই ছিল আলাদা। কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের তখনো এই উৎসবে দিকে নজর পড়েনি!  

প্রমথ চৌধূরী বলেছিলেন, নববর্ষ মানে ছিল হিসেব-নিকেশের দিন। আর এই হিসেব-নিকেশের ব্যাপারটি অর্থনৈতিক দেনা-পাওনার প্রথা ছাড়িয়েও উৎসব হয়ে ওঠে।

বছরের এই দিনে দোকানিরা হালখাতা করত। ‘হাল’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। যার বাংলা অর্থ ‘নতুন’। হালখাতা মানে ‘নতুন খাতা’। ফসল তোলার পর তা বিক্রি করে কৃষকরা বিগত বছরের দেনা মিটিয়ে দিত দোকানিদের। বিগত বছরের পুরনো খাতা ক্লোজ করে নতুন খাতা মানে হিসেবের বই খুলতেন ব্যবসায়ীরা। লাল-নীল রঙের কাভারে বাঁধাই করা লম্বা সাদা কাগজের খাতা। পেইজে পেইজে ভাঁজ। বাম পাশে জমা আর ডান পাশে খরচ। দোকানদাররা পরের বছরের বাকির হিসাব তুলত এই খাতায়। এই খাতাকে টালি খাতাও বলা হয়।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন হিসেব নিকেশ শেষ করে বৈশাখের এক তারিখে ক্রেতাদের দাওয়াত দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে মিষ্টি খাইয়ে পালন করা হতো হালখাতা। ধর্মের ভিত্তিতে রিচুয়ালও ছিল আলাদা আলাদা। মুসলিম যারা ব্যবসায়ী ছিল তারা লিখত ‘বিসমিল্লাহ ৭৮৬’ বা ‘এলাহি ভরসা’। আর যারা হিন্দু ব্যবসায়ী ছিল তারা লক্ষ্মী ও গণেশ পূজা করত। নতুন খাতায় স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে দিত। মানে ব্যবসা শুরুর আগে সবাই একটা পজেটিভ স্টার্ট চাইত নিজ নিজ স্টাইলে।

WhatsApp Image 2026-04-15 at 10.05.35 PM (1)
হালখাতা তোরজোড় করে পালিত হতো। কার্ড ছাপানো হতো, দোকান সাজানো হতো, মিষ্টি, নিমকি এমনকি গোলাপ জলও ছিটানো হতো। পুরনো ঢাকার কিছু জায়গা যেমন তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজারে এখনো কিছু কিছু দোকানে এই ট্র্যাডিশন দেখা যায়। বিশেষ করে স্বর্ণকার যারা আছে এবং জুয়েলারি শপগুলোতে। দিনব্যাপী চলত অনুষ্ঠান। মাইকে বাজত গান। দোকানগুলো রঙিন কাগজ আর ঝিলমিল রঙে সাজাতো দোকানিরা। বাবার হাত ধরে বালক-বালিকারা যেত হালখাতা খেতে। হালখাতার দিনে ময়রা একরকম মিঠাই তৈরি করত যার নাম ছিল ‘হালখাতার মিঠাই’। সেই মিঠাই তারা বছরে মাত্র একদিন তৈরি করত। এখন আর সেই মিঠাই তৈরি হয় না খুব একটা।

চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন হতো বর্ষবরণ। বর্ষবরণ উপলক্ষে তেমন বড় কোনো আয়োজন ছিল না। তবে এ উপলক্ষে মেলা বসত প্রায় সব এলাকায়। মেলায় উঠত হাতে বানানো গ্রামীণ জিনিসপত্র। দেশি ফল-ফলাদি, রসগোল্লা, জিলাপি, মোয়া, খুরমা, সন্দেশ, বাতাসা, মুড়কি, কদমা, মুরলি, খাগড়াই, নিমকি, গুড়ালি, মালশা, লাড্ডু, মাছের বড়া, গুড়ের বাতাসা, নকুল দানা, তিলের খাজা, নারিকেলের লাড্ডু, বাদাম পাপড়ি, ছানার সন্দেশ, শনপাপড়ি, চিনি ও গুড়ের মুড়ালি, কড়ই ভাজি হাসি-খুশির পানসহ আরও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য। এসবের স্বাদ ছিল অপার্থিব। বালিকা ও কিশোরীদের চুড়ি, লকেট, ব্যাগ, আলতা, কাজল, মাশকারা, লিপস্টিক, আইলেনার, মেকাপবক্স, পায়েল, বিভিন্ন প্রকারের মালা, চুলের খোঁপা...। বালক ও কিশোরদের টরটরি গাড়ি, টমটম, ডুগডুগি, বাঁশ-মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনা, নানা রঙের ঘুড়ি, নাগরদোলা, লাঠি খেলা এসব নির্মল বিনোদনের সাথে হারাম হালালের তুলনা হয় না।

হারাম-হালাল দ্বন্দ্ব
‘আল্লাহ তা‘আলা তার কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যে বিষয়ে তিনি নীরব থেকেছেন তা ক্ষমা। সুতরাং তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমাকে গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বিস্মৃত হন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক বিস্মৃত হন না’ (মারিয়াম ১৯/৬৪)।[১] আর এই হারাম সমূহই আল্লাহ তা‘আলার সীমারেখা। আল্লাহ বলেন, ‘এসব আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা এগুলির নিকটেও যেয়ো না’ (বাক্বারাহ ১৮৭)।

সব জাতির নিজস্ব বর্ষপঞ্জি থাকে না। তবে অনেকেরই আছে স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জি ও উৎসব। যেমন পার্শিয়ানদের নওরোজ, চীনাদের চাইনিজ নিউ ইয়ার বা স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল, জাপানিদের শোগাৎসু, ইউরোপীয়দের নিউ ইয়ার্স ডে। তেমনি বাঙালিদের পহেলা বৈশাখ। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সন চালু হয় আর তখন থেকেই নতুন বছরের শুরুতে হিসেব মেলানোর একটা সিস্টেম আসে। নিজস্ব বর্ষপঞ্জি থাকার কারণে নববর্ষ উদযাপনের সুযোগ পায় বাঙালিরা। ইসলাম কোনো আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে হারাম করে না। তাহলে ইসলাম সমগ্র বিশ্ববাসীর ধর্ম হতো না। ইসলাম হারাম করেছে অপচয়কে, অপব্যয়কে, অশ্লীলতাকে, আল্লাহর নাফরমানিকে। যা কিছু মন্দ তাতে ইসলাম বাধা দেয়। ইতিবাচক কোনো কিছুর উপর ইসলাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না। ফসল কাটার দিন হিসেবে আরবরা আগে ‘বুয়াস দিবস’ পালন করত। আল্লাহ সেই সংস্কৃতিকে নিষেধাজ্ঞা দেননি। বরং আয়াত নাজিল করে আনন্দ করতে বলেছেন, আল্লাহর শুকুর আদায় করতে বলেছেন, গরীবের হক আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং অপচয় করতে নিষেধ করেছেন।

আমার কথা হলো- বর্ষবরণ শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ হোক, ‘আনন্দ’ হোক কিংবা বৈশাখী; এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম কি কমবে? ঘুষ, দুর্নিতি, সিন্ডিকেট, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, বালাৎকার, অন্যায়, অবিচার কি কমবে? যদি নাই কমে তাহলে মঙ্গল-অমঙ্গলের এই যুদ্ধ বন্ধ হোক।  

এই উৎসবকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ অপচয় হয়, অপব্যয় হয় এই অপচয় রোধ করে এই অর্থ যদি গরিব-দুঃখী মানুষের কাজে আসত তাহলে নবান্ন উৎসব বলেন আর পহেলা বৈশাখ বলেন তা হারাম নয় বরং ইবাদত হিসেবে কবুল হতো।

বৈশাখ একসময় ছিল গ্রামীণ জনপদের কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের নির্মল আনন্দের মিলনমেলা। সেই স্বতঃস্ফূর্ত, সরল ও প্রাণবন্ত রূপ আবার ফিরে আসুক। এই উৎসবকে ঘিরে নোংরা রাজনীতি, কর্পোরেট বাণিজ্যের প্রভাব কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব যেন আর প্রাধান্য না পায়। ধর্ম বনাম সেক্যুলার; এ ধরনের বিভাজনমূলক বিতর্ক বন্ধ হয়ে বৈশাখ হয়ে উঠুক সবার। বৈশাখ হয়ে উঠুক সকল মানুষের, ঐক্যের এবং নির্মল আনন্দের উৎসব। নববর্ষ নিয়ে আসুক শান্তি, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বার্তা। এই উৎসব হোক মানুষের হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ।