


মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে নতুন করে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণে ইতোমধ্যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তবুও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর কারণে ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।
কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের প্রাদুর্ভাব ইবোলার বিরল “বুন্দিবুগিও” প্রজাতির কারণে ঘটছে। এই প্রজাতিটি আগে মাত্র দুইবার শনাক্ত হয়েছিল—২০০৭ এবং ২০১২ সালে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ধরনের ইবোলায় মৃত্যুহার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুন্দিবুগিও প্রজাতি শনাক্ত করাও কিছু ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ছে। কঙ্গোর প্রথম দিকের পরীক্ষাগুলোতে সংক্রমণ ধরা না পড়লেও পরবর্তী উন্নত পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এই পরিস্থিতি রোগ নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ড. আমান্ডা রোজেক বলেছেন, বৈশ্বিক মহামারির আশঙ্কা না থাকলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রজাতির ইবোলা মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ইবোলা ভাইরাস সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে শরীরে লক্ষণ প্রকাশ করে। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিলেও পরে বমি, ডায়রিয়া, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকায় রোগীদের মূলত সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ট্র্যাকিং এবং নিরাপদ চিকিৎসা ও দাফন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কাজ চলছে। তবে কঙ্গোর কিছু অঞ্চলে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের কারণে এই কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডাতেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে উগান্ডায় দুইজন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে আশার বিষয় হলো, কঙ্গো দীর্ঘদিন ধরে ইবোলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি