


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্রো জনগোষ্ঠীর কোনো তরুণী হিসেবে ভর্তি হয়েছেন য়াপাও ম্রো। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম নিশিপাড়া থেকে উঠে আসা এই তরুণীর যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো ম্রো জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা, কষ্ট ও সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাঁর এই অর্জন পাহাড়ের প্রতিটি ম্রো কিশোরীর জন্য নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।
আগামীকাল ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে তাঁর আনুষ্ঠানিক ক্লাস শুরু হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে যখন তিনি নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাবেন, তখন দুর্গম পাহাড়ে কোনো ম্রো কিশোরী হয়তো স্বপ্ন দেখবে তাঁর মতো হওয়ার। এতদিন সেই সমাজে উচ্চশিক্ষার এমন কোনো দৃশ্যমান উদাহরণ ছিল না—এখন সেই শূন্যতা পূরণ করলেন য়াপাও নিজেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিন ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সময় তাঁর চোখে বিস্ময় ছিল স্পষ্ট। টিএসসি, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, মধুর ক্যান্টিন ঘুরে তিনি পৌঁছান অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের নির্মিত ভাস্কর্যটি সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। টেলিভিশন ও পত্রিকায় বহুবার দেখা সেই প্রতীক এবার সামনে—এই অনুভূতি যেন তাঁর নতুন জীবনের শুরুটাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
প্রায় ১০৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ম্রো তরুণী এখানে পড়ার সুযোগ পেলেন। এই অর্জন শুধু য়াপাওয়ের নয়, বরং পুরো ম্রো জাতিগোষ্ঠীর জন্য এক গৌরবের অধ্যায়। বিশেষ করে যেসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখনও শিক্ষা, অবকাঠামো ও সুযোগের অভাবে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য এটি এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের নিশিপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা য়াপাওয়ের জীবন শুরু থেকেই ছিল কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা। পাহাড়ি এই গ্রামে আজও বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, হাসপাতাল কিংবা স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা নেই। জুমচাষ নির্ভর জীবিকা এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগের মধ্যে বেড়ে ওঠা ম্রো জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই এখনও লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ম্রো ভাষার গবেষক ইয়াংঙান ম্রো বলেন, এতদিন ম্রো সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কোনো তরুণীর উদাহরণ ছিল না। য়াপাও সেই অচলায়তন ভেঙেছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং পুরো জাতির আত্মবিশ্বাস জাগানোর ঘটনা।
চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় য়াপাওয়ের বাবা পারাও ম্রো একজন দরিদ্র জুমচাষি। নিজের জীবনে শিক্ষা না পেলেও সন্তানদের জন্য আলোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কষ্টের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বারবার মেয়েকে বলতেন, “আমরা তো চোখ থাকতে অন্ধ ছিলাম, তুই আমাদের আলো হবি।”
শৈশব থেকেই ডানপিটে স্বভাবের য়াপাওয়ের দিন কেটেছে পাহাড়, ঝরনা আর নদীর সঙ্গে। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির পর থানচি বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর শুরু হয় তাঁর হোস্টেল জীবন, যেখানে নিয়ম-কানুন আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
হোস্টেলে থাকাকালীন সময় ছিল অত্যন্ত কষ্টের। দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার জুটত। ভোরে উঠে পড়াশোনা, কাজ এবং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া—সব মিলিয়ে শৈশব ছিল কঠিন সংগ্রামের। অনেক সময় ক্ষুধার কষ্টে শুধু পানি পান করেই রাত কাটাতে হতো তাঁকে।
এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২২ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে বান্দরবান সরকারি কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও আবাসনের সমস্যা তাঁকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয়। পরে পাওনৈ হোস্টেলে থাকার সুযোগ তাঁর শিক্ষাজীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
এই সময়েই তিনি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আরও গভীরভাবে দেখতে শুরু করেন। সহপাঠীদের মাধ্যমে জানতে পারেন, এখনো কোনো ম্রো তরুণী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। সেই শুন্যতা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
২০২৫ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জনের পর তিনি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও মানুষের সহায়তা ও ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তিনি ঢাকায় এসে কোচিং করেন। অবশেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
তবে সাফল্যের এই পথ সহজ ছিল না। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপে ছিল অনিশ্চয়তা, অর্থসংকট এবং পারিবারিক দায়িত্বের চাপ। তবুও থেমে যাননি য়াপাও। আজ তিনি স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে থাকা-খাওয়ার খরচ ও ভবিষ্যৎ পড়াশোনার অনিশ্চয়তা।
বর্তমানে তিনি রোকেয়া হলে সিটের অপেক্ষায় আজিমপুরে একটি মেসে অবস্থান করছেন। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা—নিয়মিত মাসিক বৃত্তি বা সহায়তা, যা তাঁকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
দুর্গম পাহাড়ের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেওয়া য়াপাও ম্রোর গল্প শুধু সাফল্যের নয়, এটি এক জাতিগোষ্ঠীর সম্ভাবনা, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের নতুন দিগন্তের গল্প।