Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / জাতীয় / তুমি ছেলে, তাই কাঁদবে না!-পুরুষের কান্না কি সত্যিই শুধু দুর্বলতা? - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

তুমি ছেলে, তাই কাঁদবে না!-পুরুষের কান্না কি সত্যিই শুধু দুর্বলতা?

November 19, 2025 06:15:35 PM   দেশেরপত্র ডেস্ক
তুমি ছেলে, তাই কাঁদবে না!-পুরুষের কান্না কি সত্যিই শুধু দুর্বলতা?

“তুমি ছেলে, তুমি কাঁদবে না”—এই বাক্যটি ছেলেশিশুর জন্মলগ্ন থেকেই সমাজ তাকে যে একরৈখিক পরিচয়ে আবদ্ধ করে, তারই প্রতিফলন। পুরুষের কান্না যেন দুর্বলতার প্রতীক—এমন ধারণা বহুকাল ধরে চলে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আবেগ প্রকাশ কি সত্যিই দুর্বলতা, নাকি সমাজের চাপ ও প্রত্যাশায় দমিত এক মানবিক অনুভূতি?

পুরুষের প্রতি সমাজের ধারণা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘শক্ত’, ‘কঠোর’ ও ‘আধিপত্যবাদী’ ইমেজের ওপর নির্ভরশীল। এই স্টেরিওটাইপ ছেলেদের শেখায় কান্না মানে দুর্বলতা, আবেগ মানে নরমতা—আর নরমতা মানে অসম্মান। ফলে বড় হতে হতে পুরুষরা ধীরে ধীরে নিজেদের অনুভূতি গোপন করতে শেখে। এর ফলেই অনেকেই একসময় মানসিক নিঃসঙ্গতা, অবসাদ বা চাপের মুখে পড়ে যায়, যা প্রভাব ফেলে পরিবারে, সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে।

বিশ্বব্যাপী ১৯ নভেম্বর পালিত আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস এই বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনার সুযোগ করে দেয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল—“পুরুষ এবং ছেলেদের সমর্থন করা”। কিন্তু এই দিবসকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। নারী দিবসের মতো নিপীড়নের ইতিহাস পুরুষদের নেই—এ কারণেই অনেকে মনে করেন, ‘পুরুষকে সেলিব্রেট করার দিবস’ একটি অপ্রয়োজনীয় সমান্তরাল তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ মনে করেন, নারীর ইতিহাস এবং পুরুষের অবস্থান এক করে দেখা যায় না। কারণ হাজার বছর ধরে নারীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছে, কিন্তু পুরুষ তা হয়নি। তার মতে, সমাজ পুরুষদের যেভাবে ‘শক্ত-চরিত্র’ হিসেবে তৈরি করে, সেখান থেকেই অনেক সময় তাদের আচরণ কঠোর বা অত্যাচারী হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মনোবিজ্ঞানী মনিরা রহমান মনে করিয়ে দেন—পুরুষদের আবেগ প্রকাশ না করার যে সামাজিক চাপ, সেটাই অনেক সময় তাদের মানসিক সমস্যা বাড়ায়। নিজের অনুভূতি চেপে রাখতে রাখতে তারা সম্পর্ক, পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগেও সমস্যার মুখোমুখি হয়।

পুরুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ম্যান অ্যান্ড ম্যাসকিউলিনিটিজ স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক তাহিয়া রহমান বলেন, পুরুষদের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ও সংগ্রাম বহু সময়েই সমাজের কোলাহলের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। তাই তাদের মানবিক পরিচয়, আবেগের প্রয়োজন ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। তার মতে, পুরুষ দিবস ভালো উদ্যোগ হলেও একা এটি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না—সমাজকে সামগ্রিকভাবে বদলাতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ পুরুষ অধিকার ফাউন্ডেশন প্রতি বছর দিবসটি উদযাপন করে আসছে। তাদের মতে, পুরুষরাও নীরব নির্যাতনের শিকার হয়, কিন্তু সমাজে উপহাস কিংবা লজ্জার ভয়ে সেটা প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে এই নীরব চাপ পুরুষদের মানসিক ভাঙন বা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

প্রকৃত সমস্যা হলো—পুরুষতান্ত্রিক ধারণা যেমন নারীদের সীমাবদ্ধ করে, তেমনই পুরুষদের আবেগহীন, দায়িত্ব-নির্ভর এক কাঠামোয় আবদ্ধ করে রাখে।

যে সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ে সমানভাবে আবেগ প্রকাশের সুযোগ পায়, সমানভাবে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি পায়—সেই সমাজই প্রকৃতপক্ষে মানবিক সমাজ। পুরুষের কান্না সেখানে দুর্বলতা নয়, বরং তার মানবিকতার অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়।

পরিবর্তনের জন্য পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির নতুন চর্চা। কারণ, মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়—লিঙ্গ নয়।