


থানচির টুকটংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ অত্যন্ত চরম পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। বিদ্যালয়টি বান্দরবানের থানচি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এখানে ভাঙা-বাজা বাঁশের তৈরি ঝুপড়ি ঘরে মাত্র দুটি কক্ষে পাঠদান চলছে, যেখানে একসঙ্গে পাঁচটি শ্রেণির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বর্ষা বা শীতে কাদাপানি ও ধুলাবালিতে বই-খাতা ও শিক্ষার্থীদের পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই, ফলে শিশুদের দৈনন্দিন শিক্ষাজীবন বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠেছে।
বিদ্যালয়ে বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক এবং ৬৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছে, এক শ্রেণির পাঠদান চলাকালীন পাশের ক্লাসের শব্দের কারণে মনোযোগ হারায়। শীতে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবেশ এবং বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে যাওয়ার কারণে পড়াশোনা আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলো না থাকার কারণে চোখের সমস্যা দেখা দেয়। অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন যে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শিশুদের পড়াশোনা করানো মানেই তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করা।
বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ ২০২২ সালে নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর অর্থায়নে প্রায় এক কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে বান্দরবানের মিল্টন ট্রেডার্স ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পায়। ভবনটি তিনতলা হওয়ার পাশাপাশি আসবাবপত্র এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে চার বছর পেরিয়ে গেলেও ধীরগতির নির্মাণ কাজের কারণে ভবন এখনও ব্যবহারযোগ্য হয়নি। বর্তমানে নতুন ভবনে মাত্র চারজন শ্রমিক কাজ করছেন। নির্মাণ মিস্ত্রি জানান, জানালা-দরজা ঠিক হয়নি, সিঁড়ির রেলিং বসানো বাকি এবং আসবাবপত্রও আসেনি। কাজ সম্পন্ন হতে আরও প্রায় এক বছর লাগতে পারে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা গুংগাবি ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, বিদ্যালয়টি ২০০৮ সালে গ্রামবাসীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতীয়করণের পর ২০১৭ সালে কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে বর্তমান পরিবেশে পড়াশোনা করানো সত্যিই কষ্টকর। স্থানীয় কারবারা মাংসান ম্রো অভিযোগ করেছেন, সরকার টাকা দিয়েও চার বছরেও নতুন ভবনের কাজ শেষ হয়নি।
নিম্নমানের ইট, বালু, রড এবং স্থানীয় পাথরের কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে, ঢালাইয়ের সময় সাইট ইঞ্জিনিয়ারও থাকেন না।
অভিভাবক ও সাবেক ইউপি সদস্য টিমপাও ম্রো বলেন, কোটি টাকা খরচ হলেও শিক্ষার্থীরা এখনো ঝুপড়ি ঘরে পড়ে, ধুলা এবং শব্দের কারণে কিছুই বুঝতে পারে না, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। ইয়ং ম্রো নামে এক অভিভাবক বলেন, বৃষ্টি হলে বই-খাতা ভিজে যায়, ভারি বৃষ্টিতে ক্লাসও বন্ধ হয়ে যায়। তাই দ্রুত নতুন ভবনে ক্লাসের ব্যবস্থা চাই।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. খোকন আহম্মেদ জানান, নির্মাণ সামগ্রীর দাম ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির কারণে কাজ ধীরে চলছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী জুন ২০২৬ সালের মধ্যে যেভাবেই হোক কাজ শেষ করে হস্তান্তর করা হবে। থানচি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সোনা মৈত্র চাকমা জানিয়েছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে এবং দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এলজিইডির থানচি উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুর হানিফও বলেন, ঠিকাদারকে বারবার সতর্ক করা হলেও তিনি এখনও কাজের গতি বাড়াচ্ছেন না।
সর্বশেষ পরিস্থিতি নির্দেশ করছে, শিক্ষার মৌলিক পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত টুকটংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।