


যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শীর্ষ অবস্থানে রেখেছে। সাময়িকীটির সর্বশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে জোরালো দাবিদার তিনি।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮ মাস আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর, যখন ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। দ্য ইকোনমিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই আন্দোলনকে অনেকেই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখছেন।
সাময়িকীটি মনে করে, গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের সূচনা করতে পারে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এই মূল্যায়ন এসেছে টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুরূপ বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায়।
দ্য ইকোনমিস্ট ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ঢাকায় ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় ভিড় জমান, যার ফলে বাসটি কয়েক মাইল পথ খুব ধীর গতিতে চলতে বাধ্য হয়—যাতে অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেছে সাময়িকীটি। সেখানে বলা হয়, ২০০৮ সালের পর দেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন হয়নি এবং প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএসের গবেষণা পরিচালক শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা দুই দশক ধরে অনেক নাগরিকই মনে করতেন—তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই। তবে এবার রাজধানীর রাস্তাঘাটে নির্বাচনী ব্যানার ও পোস্টারের উপস্থিতি সেই চিত্র বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাই হবে শেষ বড় দায়িত্ব। দ্য ইকোনমিস্টের মতে, অধিকাংশ মানুষই একমত যে, এই সরকার অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তারা রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে সহায়ক হবে—এর মধ্যে রয়েছে নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে সাময়িকীটি লিখেছে, দলটি নির্বাচিত হলে ‘সব বাংলাদেশির জন্য সংযতভাবে শাসন করবে’ বলে দাবি করলেও, তাদের অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি এবং অতীতে কখনো সংসদে ১৮টির বেশি আসন না পাওয়া দলটির দেশ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা আছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই বাস্তবতায় দ্য ইকোনমিস্টের মতে, পরিস্থিতি মূলত তারেক রহমানের পক্ষেই যাচ্ছে, কারণ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, বিএনপি দীর্ঘদিন পরিচালিত হয়েছে তার প্রয়াত মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে, আর তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা—বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিনবার ক্ষমতায় আসে।
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, তারেক রহমান এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—ক্ষমতায় গেলে তার সরকার বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, পাশাপাশি আরও বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ করে দিতে কাজ করবে। তিনি পানিসংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকারও করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তারেক রহমান মনে করেন তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। তার ভাষায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট একজন দক্ষ ও বাস্তববাদী মানুষ, যিনি ব্যবসায়ী মানসিকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তারেক রহমান জোর দিয়েছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর। তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভে নিহতদের দায়ীদের বিচার হবে, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করা হবে না।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, তারেক রহমানের যুক্তি—২০২৪ সালের বিপ্লব দেখিয়েছে, জনগণের জন্য কার্যকর কোনো কর্মসূচি না থাকলে একটি সরকারের কী পরিণতি হতে পারে। প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না বলেও তিনি মনে করেন।
দেশে ফেরার পর থেকে তার বক্তব্যে অনেকটাই মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে সাময়িকীটি। তবে এখনো অনেকেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যদি পরিস্থিতি আবার বদলে যায়—এই আশঙ্কায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা এই তারেক রহমানকে আগের চেয়ে ভিন্ন ও পরিণত বলেই মনে হচ্ছে।
সূত্র: বাসস