Date: February 10, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / পোস্টার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া: নির্বাচনী সংস্কৃতির রূপান্তর ও আগামীর চ্যালেঞ্জ - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের...

পোস্টার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া: নির্বাচনী সংস্কৃতির রূপান্তর ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

January 26, 2026 12:22:15 PM   অনলাইন ডেস্ক
পোস্টার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া: নির্বাচনী সংস্কৃতির রূপান্তর ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী:
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস মানেই একসময় ছিল উৎসবের আমেজ, যার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল দেয়ালজুড়ে রঙিন পোস্টার, অলিগলিতে ব্যানার আর মাইকিংয়ের উচ্চশব্দে মুখরিত জনপদ। প্রার্থীর ছবি আর প্রতীক চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল এই কাগজের পোস্টার। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই পরিচিত দৃশ্যপট এখন বিলীন হওয়ার পথে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ এবং পরিবেশ সচেতনতার চাপে নির্বাচনী প্রচারের সেই মান্ধাতা আমলের সংস্কৃতি দ্রুতই অতীত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধের জোরালো আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই অমোঘ ইঙ্গিত। বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি এখন এক নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে—যেখানে কাগজের পোস্টারের জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল স্ক্রিন ও সোশ্যাল মিডিয়া।

নির্বাচনী পোস্টার নিষিদ্ধ করার পেছনে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক—উভয় যুক্তিই অত্যন্ত জোরালো। পোস্টার ছাপাতে এবং সাঁটাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো, তা অনেক সময় প্রার্থীদের মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করত। অর্থবান প্রার্থীরা হাজার হাজার পোস্টার দিয়ে এলাকা ছেয়ে ফেলতেন, যা তুলনামূলক কম সামর্থ্যের প্রার্থীদের জন্য দৃশ্যমানতার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণ হতো। এছাড়া নির্বাচনের পর এই বিপুল পরিমাণ পলিথিনযুক্ত পোস্টার ও কাগজ শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিবেশের যে ক্ষতি করত, তা অপূরণীয়। সেই বিবেচনায় পোস্টারমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিতভাবেই একটি আধুনিক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তবে প্রশ্ন হলো, পোস্টার উঠে যাওয়ার ফলে যে প্রচারণার শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ করছে কে? উত্তরটি এখন আমাদের হাতের মুঠোয়—সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার) কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন নির্বাচনী প্রচারের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রার্থীরা এখন আর শুধু রাজপথে নেই, তারা আছেন ভোটারের স্মার্টফোনে। ভিডিও বার্তা, সরাসরি লাইভ সেশন এবং ডিজিটাল গ্রাফিক্সের মাধ্যমে প্রার্থীরা খুব অল্প সময়ে ও নামমাত্র খরচে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তন বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তারা এখন স্লোগান নয়, প্রার্থীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শুনতে চায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছে।

কিন্তু এই উজ্জ্বল দিকের সমান্তরালে কিছু অন্ধকার ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পোস্টার ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক মাধ্যম; এটি দেখতে কোনো ইন্টারনেট সংযোগ বা কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন ছিল না। বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের বয়স্ক ভোটাররা, যারা এখনো ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নন, তাদের কাছে প্রার্থীর বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এটি নির্বাচনী প্রচারণায় এক ধরনের ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide) তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও অপপ্রচার। পোস্টারের যুগে কোনো মিথ্যা তথ্য বা চরিত্রহনন করলে তার উৎস খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল, কারণ সেখানে একটি দৃশ্যমান দায়বদ্ধতা থাকত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক আইডি, বট অ্যাকাউন্ট এবং ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে একজনের কণ্ঠে অন্য কথা বসিয়ে দেয়া কিংবা উস্কানিমূলক ভিডিও প্রচার করে মুহূর্তের মধ্যে জনমতকে ভুল পথে চালিত করা সম্ভব হচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। পোস্টার সরিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যয় কমানো এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘পোস্ট বুস্টিং’ বা পেইড অ্যাডভার্টাইজিংয়ের মাধ্যমে যে প্রার্থীর অর্থ বেশি, তিনিই বেশি মানুষের স্ক্রিনে জায়গা করে নিচ্ছেন। ফলে অ্যালগরিদম-চালিত এই প্রচারণাও কি শেষ পর্যন্ত অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে না? গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতামতের বৈচিত্র্য, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া যখন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে তথ্য প্রচার করে, তখন ভোটাররা একপেশে সত্যের মুখোমুখি হন।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনগুলো এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন। পরিবর্তনকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়, বরং একে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। তবে এই নতুন নির্বাচনী সংস্কৃতিকে টেকসই করতে হলে আমাদের প্রয়োজন তিনটি জরুরি পদক্ষেপ। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনকে ডিজিটাল প্রচারণার জন্য একটি কঠোর ও আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয় করে ভুয়া তথ্য ও ঘৃণা ছড়ানো রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে একটি নৈতিক কোড অব কন্ডাক্ট বা আচরণবিধি থাকতে হবে, যা তাদের ডিজিটাল মাধ্যমে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে।

পরিশেষে বলা যায়, পোস্টার থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রূপান্তর কেবল প্রযুক্তির বদল নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্রের বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়। পোস্টারের মানবিক স্পর্শ আর সরাসরি যোগাযোগের উষ্ণতা হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমের অবারিত সুযোগকে যদি নৈতিকতা ও আইনের শাসনে বাঁধা যায়, তবেই আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও জনবান্ধব হবে। পোস্টারের আঠা আর কালি নয়, বরং তথ্যের সত্যতা আর স্বচ্ছতাই হোক আগামীর নির্বাচনের মূল হাতিয়ার।

লেখক : কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।