Date: May 02, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

May 02, 2026 02:29:03 PM   অনলাইন ডেস্ক
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ


বর্তমানে উন্নত কি অনুন্নত- সমগ্র পৃথিবীতেই এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর উপর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে, হামলা করছে, দখল করছে; আর রাষ্ট্রগুলোর ভেতরেও ক্ষমতা নিয়ে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়ে, ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলছে হানাহানি। বিশ্বজুড়ে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাক-স্বাধীনতা হরণের এক পৈশাচিক উৎসব চলছে। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্টোনিও গুতেরেস ২০২৩ সনেই ফিলিস্তিন ইস্যুতে স্বীকার করেছেন যে, “বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং মানবাধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে গেছে।” 
প্রায় আশি বছর হয়ে গেল ব্রিটিশরা চলে গেছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে অসংখ্য আন্দোলন হয়েছে, অভ্যুত্থান হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, সংবিধান সংস্কার হয়েছে- কিন্তু মানুষের মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। লক্ষ লক্ষ মামলা আদালতে ঝুলছে, মানুষ বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, বিচার পাচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংসদ ও সচিবালয় পর্যন্ত সর্বত্র প্রতিনিয়ত মব হচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। ধর্মীয় ও মতবাদগত সংখ্যালঘুদের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠের জুলুম চলছে।
কিন্তু এরকম অবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। মানুষ নামের এই সৃষ্টিকে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাই এই পরিস্থিতির সমাধান মানুষকেই করতে হবে। চিন্তাশীল মহল বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে চিন্তা করছেন, গবেষণা করছেন, অনেক আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু কোনো কুল-কিনারা মিলছে না। আমরা বলতে চাই, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি পথ আছে। আমরা যদি মানুষের তৈরি ব্যবস্থাকে বাদ দিতে পারি এবং একটি চেতনার উপর ঐক্যবদ্ধ হতে পারি- যে আমরা সবাই এক আল্লাহর সৃষ্টি, এক পিতা-মাতার সন্তান, একটি পরিবার- তবে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমেই আমাদের সমাজে শান্তি আসতে পারে। আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে এই মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হবে, বাক-স্বাধীনতা হরণ বন্ধ হবে। 
মানবাধিকার লঙ্ঘনের মূল কারণ- উগ্রবাদ। আমরা যদি প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখব যে পৃথিবীতে প্রধান যে কয়টি ধর্ম এখন আছে, প্রায় প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের ভেতরেই নানান ধরনের উগ্রবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। তবে শুধু ধর্মের নামেই নয়, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করেও বিশ্বজুড়ে নানান ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামের নামে উগ্রবাদ।
আজ ইউরোপসহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও গণমাধ্যমে আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলামকে উগ্রবাদের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মধ্য এশিয়া ও আরব অঞ্চলে গড়ে ওঠা কিছু সংগঠন যেমন আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট, তালেবান, লস্কর-ই-তৈয়বা, আফ্রিকার আল শাবাব, বোকো হারাম ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠী গড়ে ওঠার পেছনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সামরিক শক্তিবলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে পদানত করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে ‘উন্নত মানবিক সভ্যতা’ উপহার দেওয়ার নাম করে শাসন ও শোষণ চালায়। পরবর্তীতে তারা নিজেরাই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে প্রায় পনেরো কোটি মানুষকে হত্যা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও তাদের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শাসন কাঠামোয় বিশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা রয়ে যায়। একই সঙ্গে পূর্বতন প্রভু ও পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও অব্যাহত থাকে।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনে তাদের দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। একইভাবে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়। কিন্তু এসব আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়ই উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে যাদের জীবন ও দেশ আক্রমণের শিকার হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তারাই উল্টো ‘সন্ত্রাসী’ ট্যাগ পেয়েছে। ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলার পর ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করা হয় এবং কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। অথচ ইসলাম এসেছেই সকল ফেতনা ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে; তাই এই দীনে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলামে ফেতনার বিরুদ্ধে জেহাদ করতে বলা হয়েছে। ইসলামের মূলনীতি হলো, এই দীনে কোনো জবরদস্তি নেই (সুরা বাকারা ২:১৫৬)। ইসলাম কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে শরিয়তের কোনো বিধান চাপিয়ে দেয় না, কাউকে ধর্মন্তরিত হতেও বাধ্য করে না। আল্লাহ বলেন, তিনি কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না (সুরা বাকারা ২:২৮৬)। তিনি আরো বলেন, অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য (সুরা মায়েদা ৫:৩২)। একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না (সুরা বনি ইসরাইল ১৭:১৫)। ইসলামের উদ্দেশ্য এমন একটি জীবনপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা যা মানুষকে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করবে এবং সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার নির্মূল করে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
পক্ষান্তরে গত তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায় যে, প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন, পররাজ্য দখলের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অস্ত্রের বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসন ও উপনিবেশবাদী মানসিকতাই উগ্রবাদের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চলে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি সহনশীল রাষ্ট্র, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশে ছয় শতাধিক মবের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে; এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ অন্তত ৩২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। বিভিন্ন স্থাপনা ও মাজারে ধর্মের নামে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অতীতেও আমাদের দেশে বিরুদ্ধমতের মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, কখনও হলি আর্টিজানের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি অসংখ্যবার কথিত তওহীদী জনতার দ্বারা সংঘটিত মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে কট্টরপন্থা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো হয়েছে। 
উগ্রবাদ মোকাবেলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রধানত শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। পুলিশ, আইন, ক্রসফায়ার, ফাঁসি ও রিমান্ডের মাধ্যমে নির্মূলের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অর্থ ব্যয় করেও উগ্রবাদ নির্মূল করা যায়নি। কারণ উগ্রবাদীরা তাদের কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বলে মনে করে। ফলে তাদেরকে ফেরানোর জন্য যত বেশি শক্তি প্রয়োগ বা শাস্তি দেওয়া হয়, ততই তাদের ঈমানি চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং তারা আরও বেপরোয়া ও কৌশলী হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের সাবেক মহাপরিচালক বান কি মুন বলেছেন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ আরো বেড়েই গেছে (১৭ জানুয়ারি, ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলো)। 
এই অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে প্রয়োজন শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি উগ্রবাদী মতাদর্শকে আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করা। উগ্রবাদীরা কোর’আন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষদের ওপর হামলা চালানোর জন্য মিথ্যা ফতোয়া প্রদান করছে। এই অপব্যাখ্যাকে মোকাবেলার জন্য একটি সঠিক আদর্শ এবং শক্তিশালী পাল্টা বক্তব্য (ঈড়ঁহঃবৎ-ঘধৎৎধঃরাব) জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর এই পাল্টা বক্তব্য হতে হবে ইসলামের দলিলভিত্তিক। উগ্রবাদী মতাদর্শকে কোর’আন, হাদিস ও ইতিহাসের আলোকে খণ্ডন করে ভুল প্রমাণ করতে হবে। মানুষ যখন এগুলো জানতে পারবে, তখন তারা আর উগ্রবাদীদের অপব্যাখ্যা দ্বারা বিভ্রান্ত হবে না; বরং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে অনুসরণ করবে। 
যেহেতু কোর’আন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, এখানে নামাজ, রোজার মতো বিষয়ের পাশাপাশি যুদ্ধনীতি, দণ্ডবিধি ও বিচারব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিধানও রয়েছে। তবে বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী কোর’আনের জেহাদ, কেতাল এবং কেসাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে। তাদের এসব কর্মকাণ্ড দেখে যদি আমরা জেহাদ বা কেতালের আয়াতগুলোকে অস্বীকার করি, অথবা সেগুলো নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাই, তাহলে তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে মানুষ ইসলামবিদ্বেষী হয়ে উঠতে পারে এবং মনে করতে পারে যে কোর’আনই বুঝি উগ্রবাদের উৎস বা সমর্থক।
জেহাদের নামে চলমান উগ্রবাদকে মোকাবিলা করতে হলে সর্বপ্রথম জানতে হবে - জেহাদের প্রকৃত অর্থ কী। জেহাদ মানে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও বিপ্লব। আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যায় ও অবিচারপূর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদর্শিক, নৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে যে সর্বাত্মক আন্দোলন পরিচালিত হয়, সেটিই জেহাদ। আর ‘কেতাল’ অর্থ যুদ্ধ, যা জেহাদের সর্বোচ্চ স্তর। মানবসমাজে বিদ্যমান অন্যায় ও জুলুমের ব্যবস্থাকে উৎখাত করে আল্লাহর দেওয়া ন্যায়ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে সশস্ত্র সংগ্রাম সংঘটিত হয়, তাকে কেতাল বলা হয়। জেহাদ ও কেতালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জেহাদ একটি ব্যাপক সংগ্রাম, যা দলগত ও সামাজিক পর্যায়ে নানা উপায়ে এবং সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে পরিচালিত হয়। সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে মুখে বলা, বই লেখা, চিন্তা-যুক্তির মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আদর্শিক আন্দোলন গড়ে তোলা- এ সবই জেহাদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কেতাল বা যুদ্ধ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিষয়। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি ব্যতীত কেতাল করা যায় না। রসুলাল্লাহ (সা.) নবুয়ত লাভের পর থেকেই সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা জেহাদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ যুদ্ধের অনুমতি দেন তখনই, যখন তিনি মদিনা নগররাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এরপর তিনি সংগঠিত সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। অতএব, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কোনো গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে সশস্ত্র হামলা বা হত্যাকাণ্ড চালানো ইসলামে সম্পূর্ণ অবৈধ। 
একইভাবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে কেসাসের বিধান বাধ্যতামূলক করেছেন (সুরা বাকারা ২:১৭৮)। কেসাস অর্থ হলো সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেমন প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, সমান আঘাতের বদলে সমান আঘাত ইত্যাদি (সুরা মায়েদা ৫:৪৫)। ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বে বিচার বিভাগ গঠিত হবে। বিচারকরা তদন্ত, সাক্ষী, প্রমাণ ও স্বীকারোক্তি গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর করবেন। বাদী চাইলে অভিযুক্তকে ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা ক্ষতির অর্থমূল্য গ্রহণ করতে পারেন। তবে এই সিদ্ধান্তও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার (ঔঁফরপরধষ চৎড়পবফঁৎব) মধ্যেই গৃহীত হবে। এ ধরনের শাস্তি কোনো ব্যক্তি বা মুফতির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কার্যকর হতে পারে না। 
কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক (সুরা মায়েদা ৫:৪৪, ৪৫, ৪৭)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো এবং তারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করে’ (সুরা তওবা ৯:১২৩)। সুতরাং জনগণকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে কে মো’মেন, কে কাফের। যদি তা না করা হয়, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব ফকিহ, শায়েখ বা মুফতিদের ফতোয়ার ভিত্তিতে এই আয়াতগুলো ব্যবহার করে বিচারপতি ও আইনজীবীদের উপর হামলা চালাতে পারে। 
তবে উগ্রবাদের বিস্তার ঠেকাতে শুধু বলপ্রয়োগ বা পাল্টা আদর্শ প্রচারই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও শক্তিশালী নীতিমালা। মানুষকে তাদের জন্মগত ও প্রাকৃতিক অধিকার, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও জীবনধারা পছন্দ করার অধিকার, জীবনধারণ ও সম্পদ রক্ষার অধিকার এবং নিজের ভূমিতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘ চার্টারেও এই ঝবষভ-উবঃবৎসরহধঃরড়হ জরমযঃ এর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে (অৎঃরপষব ১(২)-১৯৪৫)।
সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এটি স্পষ্ট ও শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সেটা হলো- মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে আল্লাহর দেওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। কারণ বিদ্যমান পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মানুষের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে ইসলাম ও পশ্চিমা ব্যবস্থার মধ্যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে। উদাহরণস্বরূপ, সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি, যার কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সিন্ডিকেট এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলিমরা সুদকে হারাম মনে করলেও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুদের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় তাদেরকে তা মেনে চলতে হয়। যে ব্যবস্থাগুলো আল্লাহর হুকুমের বিপরীত, সেগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মবিশ্বাসী মুসলমানদের প্রতিবাদী চেতনা জন্ম নেয়, যা কখনো কখনো উগ্রবাদে রূপ নেয়।   
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মুসলিমরা যেভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছে, এটি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে যতই শক্তি প্রয়োগ করা হোক না কেন উগ্রবাদের উত্থান বন্ধ করা যাবে না। সেটি বন্ধ করতে আঞ্চলিকভাবে রাষ্ট্রগুলোকে সমঝোতায় আসতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর, হেযবুত তওহীদ।]