


ফরিদপুরের সদরপুরে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িতে গুপ্তধনের আশায় প্রকাশ্যেই চলছে খনন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র দিনের বেলাতেই পুকুর খুঁড়ে মূল্যবান প্রত্নসম্পদ তুলে নিচ্ছে, অথচ নজরদারি নেই প্রশাসনের।
ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার বাইশরশি জমিদার বাড়িতে ঘটে চলা এই ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন লুটপাটের ঝুঁকিতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জমিদার বাড়ির পুকুরের ‘বউঘাট’ এলাকায় খনন চালিয়ে নিচের মাটি তুলে নেওয়া হয়েছে। খননের জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা পাথরের মূর্তি, কালো পাথরের বাটি, ধূপকাঠির পাত্র, পূজার সামগ্রী এবং দোয়াতকালির পাত্রের অংশবিশেষ—যা ইঙ্গিত দেয় এখানে মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন থাকতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দিনের আলোতেই কয়েকজন ব্যক্তি মাটি তুলে পাশের পুকুরে ধুয়ে সেখান থেকে স্বর্ণালংকার, তামা-রুপার মুদ্রা, পাথরের তৈরি বিভিন্ন বস্তুসহ পুরোনো সামগ্রী সংগ্রহ করছে। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থেকে আসা বলে জানিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় এই জমিদার পরিবার ফরিদপুর ও বরিশালসহ ২২টি পরগনার অধিপতি ছিল। ১৭শ শতকে লবণ ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তারা জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে। দেশভাগের পর তারা এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলে বাড়িটি সরকারি তত্ত্বাবধানে আসে।
যে স্থানে বর্তমানে খনন চলছে, সেটি একসময় জমিদার পরিবারের নারীদের স্নানের ঘাট হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবেও পরিচিত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, অতীতে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান রত্নের আশায়ই এই খনন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জমিদার বাড়িটি একসময় প্রায় ৫০ একর জমির ওপর বিস্তৃত ছিল। সেখানে ছিল বাগানবাড়ি, শানবাঁধানো পুকুর, পূজামণ্ডপ এবং ছোট-বড় ১৪টি দালান। বর্তমানে প্রায় ৩০ একর জমি টিকে থাকলেও বাকি অংশ দখল হয়ে গেছে। অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই এখান থেকে মূল্যবান কাঠ, লোহার কারুকাজ এবং প্রত্ননিদর্শন লুট হয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলায় এলাকা অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়, এমনকি দিনের বেলাতেও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা ঘটে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জমিদার বাড়ির ভেতরেই উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত আনজুম পিয়া জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি এখন অবহেলা ও লুটপাটের শিকার। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে দেশের অতীত ঐতিহ্য।