Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / আন্তর্জাতিক / পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন শুরু মিয়ানমারে - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন শুরু মিয়ানমারে

December 28, 2025 10:32:02 AM   আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন শুরু মিয়ানমারে

পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক দমন–পীড়ন এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যেই মিয়ানমারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত বেসামরিক সরকার উৎখাতের প্রায় পাঁচ বছর পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকরা। তবে দেশজুড়ে চলমান সংঘাত, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতি এবং সেনাশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই নির্বাচনকে অনেকেই ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ ও ‘নাটকীয় আয়োজন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
জান্তাশাসিত নির্বাচন কমিশনের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর থেকে আগামী ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন ধাপে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রোববার প্রথম ধাপে রাজধানী নেইপিদো, বাণিজ্যিক রাজধানী ও বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়সহ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি শহর ও গ্রামাঞ্চলে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক আইনসভার জন্য একযোগে ভোটগ্রহণ চলছে।
তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল ও প্রদেশগুলোতে কোনো ভোটগ্রহণ হচ্ছে না। মিয়ানমারের মোট ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে তিন ধাপে ২৬৫টিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে এসব এলাকার সবগুলোতেই জান্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে দেশের একটি বড় অংশ কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
মিয়ানমারে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের নভেম্বরে। সে নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইংয়ের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয়।
অভ্যুত্থানের পরপরই অং সান সু চিসহ এনএলডির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাজার হাজার নেতা-কর্মী এখনো কারাগারে রয়েছেন। সু চির বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা দায়ের করেছে জান্তা সরকার। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১৫০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। ২০২৩ সালে জান্তানিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কমিশন এনএলডিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
এর ফলে এবারের নির্বাচনে এনএলডিসহ ২০২০ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই অংশ নিচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নির্বাচনী মাঠে সবচেয়ে প্রভাবশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোট শেষে এই দলই সরকার গঠন করবে।
অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে সেনাবাহিনী ব্যাপক সহিংসতা চালায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর তীব্র সংঘাত শুরু হয়। অনেক এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এলাকা দখলে নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশসহ মিয়ানমারের প্রায় ৩৩ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মি, কারেন লিবারেশন ফোর্সসহ একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন আয়োজনকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং একাধিক পশ্চিমা দেশ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক সম্প্রতি বলেন, সহিংসতা ও দমন–পীড়নের পরিবেশে মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা অনুপস্থিত থাকায় জনগণের মুক্ত ও অর্থবহ অংশগ্রহণের কোনো বাস্তব সুযোগ নেই।
তবে এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে জান্তা সরকার দাবি করছে, এই নির্বাচন মিয়ানমারের চলমান সংঘাত কাটিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে একটি ‘নতুন অধ্যায়’ সূচনার সুযোগ তৈরি করবে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, এই নির্বাচন দেশকে সংকট ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বের করে শান্তি ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি গড়ে দেবে।