


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার মা রোকেয়া খানমের একটি আবেগঘন ফেসবুক স্ট্যাটাস। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাতে দেওয়া এই পোস্টে তিনি নিজেকে ‘গর্বিত বিপ্লবীর মা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ছেলের রাজনৈতিক জীবন, পারিবারিক ত্যাগ এবং অতীতের নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। স্ট্যাটাসটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং নানা মহলে আলোচনার ঝড় তোলে।
রোকেয়া খানম তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, একসময় ছেলেকে নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় থাকলেও একটি ঘটনার পর তার মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আসে। তিনি জানান, ১৫ জুলাই পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগে থাকলেও যেদিন আবু সাঈদ শাহাদাতবরণ করেন, সেদিন থেকেই তিনি নিজের একমাত্র সন্তানকে দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
তিনি আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করেন, তার ছেলেকে যারা ঘৃণা করে তারা দলীয় কারণে করে, আর যারা ভালোবাসে তারা দেশের স্বার্থে ভালোবাসে। তার এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে তাদের পরিবারের ওপর অতীতে নেমে আসা রাজনৈতিক নির্যাতনের চিত্রও। রোকেয়া খানম দাবি করেন, তার আপন ভাইকে বিএনপি করার অভিযোগে উল্টো করে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, তার স্বামীকেও জামায়াত সমর্থনের অভিযোগে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, যার পরিণতিতে তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে ২০১৮ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ছেলেকে আড়ালে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আক্ষেপ করে বলেন, অনেকেই এখন প্রশ্ন তোলেন—২০২৪ সালের আগে সালাহউদ্দিন কোথায় ছিল। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না, সেই সময়টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন শাসনব্যবস্থা তার ছেলের কৈশোর কেড়ে নিয়েছে। যারা তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন, তারা এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারেন না। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে তার ছেলের ব্যক্তিগত আবেগও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
একজন মা হিসেবে নিজের অনুভূতির কথাও অকপটে তুলে ধরেছেন রোকেয়া খানম। তিনি বলেন, আগে ছেলেকে বারবার থামতে বললেও এখন আর তা বলেন না। বরং তার প্রার্থনা—যেদিন আল্লাহ তার ছেলেকে নিয়ে যাবেন, সেদিন যেন তিনি তাকে হাসিমুখে বিদায় জানাতে পারেন।
স্ট্যাটাসে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের একটি পোস্টের প্রসঙ্গ টেনে জানান, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত তাদের পরিবারকে ঘরবন্দী করে রাখা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে চাপ দিয়ে বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনতে হবে, না হলে তার অসুস্থ স্বামীকে হত্যা করা হবে। তবে এমন হুমকির মুখেও তিনি ছেলেকে থামতে বলেননি। বরং প্রশ্ন ছুড়ে দেন—ছেলের জন্য তাকে হত্যা করা হবে, নাকি তার অসুস্থ স্বামীকে?
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টিও উঠে আসে তার লেখায়। অনেকেই তাকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দিলেও তিনি জানান, প্রয়োজনে তিনি জিডি করবেন, তবে নিজের নিরাপত্তার জন্য নয়। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই সময়ের সাক্ষ্য রেখে যাওয়ার জন্যই এমন পদক্ষেপ নেবেন।
সবশেষে তিনি একটি ব্যক্তিগত বেদনার কথাও তুলে ধরেন। যে ভাই একসময় রাজনৈতিক কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, সেই ভাইই এখন সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তার ছেলে ক্ষমতার অন্যায় ও ত্রুটির বিরুদ্ধে কথা বলবে—আর তখনই সেই ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত মানুষরাই তার বিরোধিতা করবে।