Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / আন্তর্জাতিক / ৩৪ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পার করান এক শিক্ষক - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

৩৪ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পার করান এক শিক্ষক

January 10, 2026 11:25:25 AM   আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩৪ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পার করান এক শিক্ষক

চীনের একটি স্কুলে প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় এক অনন্য মানবিক দৃশ্য দিয়ে। ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে সাদা গ্লাভস ও প্রতিফলক ট্রাফিক জ্যাকেট পরে এক ব্যক্তি হাতের ইশারায় গাড়ি থামাচ্ছেন, আবার সারি সারি শিক্ষার্থীকে নিরাপদে রাস্তা পার করাচ্ছেন। দূর থেকে দেখলে তাকে ট্রাফিক পুলিশ বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোনো পুলিশ নন—তিনি একজন শিক্ষক, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, স্কুলটির উপপ্রধান শিক্ষক।

এই ব্যতিক্রমী মানুষটির নাম উ বিন। বয়স ৬০ বছর। তিনি চীনের হাংঝৌ শহরের হাংঝৌ ১৪ নম্বর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উপপ্রধান শিক্ষক। টানা ৩৪ বছর ধরে, প্রতিদিন সকালবেলা প্রায় এক ঘণ্টা সময় তিনি স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সহায়তা করছেন। কোনো পারিশ্রমিক নয়, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়—শুধুই দায়িত্ববোধ।

বিদ্যালয়টি অবস্থিত শহরের ব্যস্ত লংতেং রোডের পাশে, যেখানে রয়েছে আট লেনের একটি সড়ক। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থী স্কুলে প্রবেশ করে। এই সময়টিতেই যান চলাচল থাকে সবচেয়ে বেশি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সর্বোচ্চ। এই ঝুঁকি কমাতেই প্রতিদিন ভোর থেকেই প্রস্তুতি নেন উ বিন।

প্রতিদিন সকাল ৬টা ১০ মিনিটে তিনি স্কুলে পৌঁছান। সংক্ষিপ্ত নাশতা শেষে গেটের সামনে অবস্থান নেন। বৃষ্টির দিনে নিরাপত্তা টিমের জন্য ছাতা, বুট ও রেইন জ্যাকেটের ব্যবস্থাও করেন তিনি নিজেই। দায়িত্ব পালনের সময় তার কাছে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উ বিনের ভাষায়, “এক সেকেন্ডের অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এটা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি দায়িত্বহীনতা।”

প্রতিফলক জ্যাকেট ও সাদা গ্লাভসে তাকে দেখে খুব কম মানুষই বুঝতে পারেন, এই ব্যক্তি একজন উপপ্রধান শিক্ষক। প্রতিটি লেন গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। কখন গাড়ি থামাতে হবে, কখন শিক্ষার্থীদের পার করাতে হবে—সবকিছুই যেন তার চোখের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়।

শীতকালে কুয়াশা নামলে দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দৃশ্যমানতা কমে যায়, গাড়ির গতিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমন সময় উ বিন আরও সতর্ক থাকেন। তার আশঙ্কা থাকে—একটি গাড়িও যেন চোখের আড়ালে না চলে যায়।

শুধু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেই থেমে থাকে না তার দায়িত্ব। স্কুল গেটের সামনে কোনো ঝামেলা বা ভুল বোঝাবুঝি হলে তিনিই হয়ে ওঠেন মধ্যস্থতাকারী। অনেক অভিভাবকই তার সাবেক শিক্ষার্থী। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “আমি সামনে এলেই সবাই শান্ত হয়ে যায়। কেউ আর তর্ক করতে চায় না।”

এই দায়িত্বের সূচনা ১৯৯১ সালে। তখন উ বিনের বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। শুরুতে তার উদ্দেশ্য ছিল, সকালে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মুখ ও নাম চিনে নেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল গেটের এই দায়িত্ব তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। এমনকি কিছু বছর তাকে ভোর ৫টা ৩০ মিনিটেই বাড়ি ছাড়তে হয়েছে, কুয়াশাচ্ছন্ন শহর পেরিয়ে সময়মতো স্কুলে পৌঁছানোর জন্য।

দীর্ঘ ৩৪ বছরের এই নিরব দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় অর্জন—একজন শিক্ষার্থীরও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। উ বিন বলেন, “আমি ভয় থেকেই কাজটা করে গেছি। শিশুরা কয়েক সেকেন্ডে রাস্তা পার হয়। কিন্তু যদি কিছু ঘটে যায়, সেটা একটি পরিবারের আজীবনের ট্র্যাজেডি হয়ে যায়।”

অনেকেই জানেন না, উ বিন দীর্ঘদিন ধরে অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডাইলাইটিসে ভুগছেন। এই রোগে তার মেরুদণ্ড ও কোমরের জয়েন্টে প্রদাহ হয়েছে। তীব্র পিঠব্যথা থাকা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করেই প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থেকেছেন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য।

এই গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিভাবকরা পার্কিং ও ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে আরও সচেতন হয়েছেন। পাশাপাশি তরুণ শিক্ষক ও স্কুল কর্মীরাও স্বেচ্ছায় তার দলে যোগ দিয়েছেন। নীরবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই উ বিন হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার এক জীবন্ত প্রতীক।