Date: February 01, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / জাতীয় / অর্থে তথ্য বিকৃতি: হাসিনা আমলে পলকের থেকে ১৫ লাখ টাকার ‘ঘুষ’ নেয় বাংলা উইকিপিডিয়া! - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে স...

অর্থে তথ্য বিকৃতি: হাসিনা আমলে পলকের থেকে ১৫ লাখ টাকার ‘ঘুষ’ নেয় বাংলা উইকিপিডিয়া!

January 31, 2026 12:49:58 PM   অনলাইন ডেস্ক
অর্থে তথ্য বিকৃতি: হাসিনা আমলে পলকের থেকে ১৫ লাখ টাকার ‘ঘুষ’ নেয় বাংলা উইকিপিডিয়া!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
মুক্ত তথ্যভাণ্ডার উইকিপিডিয়া। যেখানে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নির্ভর করে নিরপেক্ষ তথ্যের জন্য। কিন্তু এই নিরপেক্ষতার আড়ালেই ২০১৮ সালে রচিত হয়েছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। অভিযোগ ওঠে, সরকারের প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায় অর্থের বিনিময়ে তথ্য বিকৃতির। পর্দার আড়ালের সেই ‘গোপন লেনদেন’ ফাঁস হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে আন্তর্জাতিক উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়। বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উইকিপিডিয়ার নীতি বিসর্জন দিয়ে ১৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে এজেন্ডা বাস্তবায়নের নেপথ্য কাহিনী।

২০১৮ সালের শুরুর দিকে বাংলা উইকিপিডিয়ার কিছু স্পর্শকাতর নিবন্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অভিজ্ঞ উইকিপিডিয়ানদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। দেখা যায়, সরকারের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রকল্পের তথ্যে অস্বাভাবিক ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। শুরুতে একে সাধারণ সম্পাদনা মনে করা হলেও পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ তথ্য ও বিভিন্ন সূত্র থেকে অভিযোগ ওঠে -এর পেছনে কাজ করছে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলা উইকিপিডিয়ার তৎকালীন প্রভাবশালী প্রশাসক এবং উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারক নুরুন্নবী চৌধুরী হাসিব সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় জড়িত। অভিযোগ ওঠে, তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নেতৃত্বাধীন আইসিটি বিভাগ সংশ্লিষ্ট তহবিল থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা (প্রায় ১৭,৬৮৫ মার্কিন ডলার) গ্রহণ করেন তিনি। এই অর্থের উদ্দেশ্য ছিল একটাই উইকিপিডিয়ার কঠোর নিরপেক্ষতা নীতিকে পাশ কাটিয়ে সরকারের অনুকূলে তথ্য উপস্থাপন করা, যা উইকিপিডিয়ার ভাষায় ‘আনডিসক্লোজড পেইড এডিটিং’।

বিষয়টি নিয়ে উইকিপিডিয়ার গ্লোবাল ভলান্টিয়াররা সন্দেহ পোষণ করলে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর যখন আর্থিক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ মেলে, তখন আর পিছু হঠার পথ ছিল না। ২০১৮ সালের অক্টোবরে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন নুরুন্নবী চৌধুরী হাসিবকে উইকিপিডিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার বা ‘গ্লোবাল ব্লক’ করে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, উইকিপিডিয়ার ইতিহাসে এটি ছিল এক অভাবনীয় ঘটনা। একজন নির্বাচিত প্রশাসক, যিনি কি না ২০১৫ সালে ফাউন্ডেশনের ‘গ্র্যান্ড অ্যাডভাইজরি কমিটির’ সদস্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তার এমন নৈতিক স্খলন পুরো বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলা উইকিপিডিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আন্তর্জাতিক এই নিষেধাজ্ঞার ঢেউ আছড়ে পড়ে স্থানীয় উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ চ্যাপ্টারেও। সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষায় ২০১৮ সালের অক্টোবরেই এক জরুরি রেজোলিউশনের মাধ্যমে নুরুন্নবী চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল করা হয়। রেজোলিউশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বিতর্কিত ‘পেইড এডিটিং’ এবং স্বার্থের সংঘাত গোপন রাখার অপরাধে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

উল্লেখ্য বর্তমানে উইকিপিডিয়ার নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী গুরুতর সব অভিযোগ ও নজিরবিহীন আইনি লড়াই চলছে। সম্প্রতি ভারতের শীর্ষস্থানীয় বার্তা সংস্থা এএনআই উইকিপিডিয়ার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছে, যার প্রেক্ষিতে ভারতের উচ্চ আদালত এমনকি দেশটিতে উইকিপিডিয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সৌদি আরবে রাজপরিবারের পক্ষে তথ্য ম্যানিপুলেট করতে উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের মধ্যে সরকারি এজেন্টদের অনুপ্রবেশের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ফাঁস হয়েছে। এর বাইরেও ইলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উইকিপিডিয়াকে ‘মতাদর্শগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে তথ্য পরিবর্তনের মতো কলঙ্কিত ঘটনা বারবার সামনে আসায় এখন বিশ্বজুড়ে উইকিপিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এমনকি অনেক দেশে সরকারবিরোধী তথ্য প্রচারের দায়ে এটি বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধও হয়েছে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যের এই নিরপেক্ষতা সংকট এখনো পিছু ছাড়েনি। সম্প্রতি বাংলাদেশের অরাজনৈতিক সংগঠন হেযবুত তওহীদ উইকিপিডিয়ার বিরুদ্ধে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছে। তাদের অভিযোগ, উইকিপিডিয়ায় তাদের সংগঠন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে সংশোধনের চেষ্টা করেও প্রতিকার মেলেনি। সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি আবারো প্রমাণ করে উইকিপিডিয়ার মতো প্ল্যাটফর্মে তথ্যের সঠিকতা বজায় রাখা এবং কুচক্রী মহলের এজেন্ডা রুখে দেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং।