


ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর গ্রামের তিন বোন-স্বপ্নীল, স্বর্ণালী ও সেঁজুতি বর্মন-একই দিনে জন্ম নিয়ে যেমন বেড়ে উঠেছেন, তেমনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এসএসসি পরীক্ষাতেও একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। তাদের এই অভিন্ন পথচলা এলাকায় তৈরি করেছে বিশেষ আলোচনার।
তিন বোনের জন্ম ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেনের সংসারে বড় বোন মৃদুলা ও ছোট ভাই প্রদ্যুৎসহ তারা বেড়ে উঠেছেন একসঙ্গে। ছোটবেলা থেকেই তাদের জীবনযাত্রা, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রায় একই ছন্দে চলেছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন এই তিন বোন। পরীক্ষার আগে সোমবার (২০ এপ্রিল) তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তারা। পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করে একে অপরকে সহযোগিতা করছেন তারা।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তারা একসঙ্গে এগিয়ে চলেছেন। প্রথমে কিন্ডারগার্টেন এবং পরে আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। একই চেহারার কারণে শিক্ষক ও সহপাঠীদের অনেক সময় তাদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে যেত।
২০১৮ সালে তারা ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী একই সঙ্গে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে সেঁজুতি তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও একই স্কুলে পড়লেও স্বর্ণালীকে আলাদা শাখায় পড়তে হয়েছে। এবার তারা তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
তিন বোনই পড়াশোনায় সমান মনোযোগী এবং ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করে আসছেন। তবে বিষয়ভিত্তিক পছন্দে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে-স্বপ্নীলের পছন্দ জীববিজ্ঞান ও বাংলা সাহিত্য, স্বর্ণালীর জীববিজ্ঞান ও রসায়ন, আর সেঁজুতির প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান।
খাবার ও শখেও রয়েছে মিল-অমিলের মিশ্রণ। তিনজনেরই প্রিয় খাবার বিরিয়ানি হলেও অন্যান্য খাবারে ভিন্নতা রয়েছে। পোশাকেও আগে মিল থাকলেও এখন নিজস্ব পছন্দ তৈরি হয়েছে। থ্রি-পিস সবারই পছন্দের হলেও বিশেষ দিনে তারা শাড়ি পরতে ভালোবাসেন।
শুধু পড়াশোনা নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় এই তিন বোন। তারা ঠাকুরগাঁও বেতারের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী হিসেবে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। অবসরে বই পড়া, গান শোনা ও গান গাওয়া তাদের অন্যতম প্রিয় কাজ।
তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আলাদা পথে এগিয়েছে। স্বপ্নীল হতে চায় বিসিএস ক্যাডার, স্বর্ণালীর লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া এবং সেঁজুতি হতে চান শিক্ষক।
একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া এবং একসঙ্গে পড়াশোনা- তাদের জীবনের নিয়মিত অংশ। ছোটখাটো ঝগড়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, বরং দ্রুতই মিল হয়ে যায় বলে জানান তারা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ জানান, তিনজনকে আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত, তাই কখনো কখনো আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করতে হতো।
তাদের মা ময়না রানী সেন বলেন, তিন মেয়েকে একসঙ্গে বড় করা সহজ ছিল না, তবে তাদের ভালোবাসা সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।
বাবা ঠান্ডারাম বর্মন জানান, শুরুতে তিন মেয়ে হওয়ায় দুশ্চিন্তা থাকলেও এখন তাদের সাফল্যেই তিনি গর্বিত এবং ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে চান।