Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / রকমারি / জলাতঙ্ক দিবস আজ: সংক্রমণ কমলেও রয়ে গেছে সংকট - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

জলাতঙ্ক দিবস আজ: সংক্রমণ কমলেও রয়ে গেছে সংকট

September 28, 2025 01:20:06 PM   দেশেরপত্র ডেস্ক
জলাতঙ্ক দিবস আজ: সংক্রমণ কমলেও রয়ে গেছে সংকট

 

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, অর্থাৎ প্রতি ৯ মিনিটে একজন। মৃত্যু শুধু নয়, বিশ্বে এই রোগের কারণে প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮.৬ বিলিয়ন ডলার। ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস, আর এ বছরের প্রতিপাদ্য—“জলাতঙ্ক নির্মূলে কাম করি তুমি-আমি সবাই মিলে”—সেটিই মনে করিয়ে দেয় যে এ লড়াই একা কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই রোগ নিয়ে আশার খবরও রয়েছে। এক সময় দেশে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে প্রাণ হারাত। ২০১২ সালে এই সংখ্যা ছিল দুই হাজারের মতো, যা ২০২৪ সালে এসে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৬ জনে। রোগীর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে—২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ১৪৩ জন, ২০২৪ সালে তা কমে ১ হাজার ১৩০ জনে নেমে এসেছে। এই কমতির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে টিকাদান, জনসচেতনতা এবং পশু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম।

তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার মাঝেও রয়েছে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ। দেশের মধ্যে এখন আর জলাতঙ্কের টিকা উৎপাদন হয় না। প্রায় দেড় বছর ধরে প্রয়োজনীয় ‘সিড’ (ভ্যাকসিন তৈরির মূল উপাদান) না থাকায় দেশীয়ভাবে টিকা উৎপাদন বন্ধ। ফলে পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদিও এসিআই এগ্রি বিজনেসের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান এ ঘাটতি পূরণে কাজ করছে, তবুও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়। প্রতিটি রোগীকে ২ থেকে ৫টি ডোজ নিতে হয়, যা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে অনেকের জন্য।

বিশ্বে জলাতঙ্কে মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশের পেছনে থাকে কুকুরের কামড়। বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে পথ কুকুরের অপ্রতিরোধ্য বংশবৃদ্ধির কারণে। ঢাকায় বর্তমানে পথ কুকুরের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার—গত তিন বছরে যা দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিকভাবে কুকুরদের খাওয়ানোর সংস্কৃতি এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে এই সংখ্যা বাড়ছে। দেশে এখন প্রতি ৯৬ জন মানুষের বিপরীতে একটি কুকুর রয়েছে।

যদিও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তবুও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বর্তমান টিকাদান পদ্ধতিতে আরও পরিকল্পনা ও সমন্বয় দরকার। শুধু শহরের একটি অংশে বা কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে কুকুরদের টিকা দিলেই হবে না, সারা দেশে একযোগে বড় পরিসরে কুকুর টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে, চলতি বছর আরও ২০ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জলাতঙ্ক নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অনেকেই কুকুর বা বিড়ালের আঁচড় বা হালকা কামড়কে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করেন। অথচ এই অবহেলাই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আর থাকে না। তাই আঁচড় বা কামড়ের পর ক্ষত না হলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “জলাতঙ্ক নিয়ে আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা। আমাদের কুকুরদের প্রতি মমতা দেখাতে হবে, তাদের তাড়ানোর চেয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাই বেশি জরুরি।”

এ প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবু সুফিয়ান বলেন, “মানুষের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে প্রাণীদের স্বাস্থ্যও ভালো রাখতে হবে।” তার মতে, কুকুর সহজে কাউকে কামড়ায় না, বরং আঘাত পেলে বা হুমকি মনে করলেই প্রতিক্রিয়া দেখায়। কাজেই আমাদের আচরণেও মানবিকতা আনতে হবে।

সবমিলিয়ে বাংলাদেশে জলাতঙ্ক পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসলেও, এটি নির্মূল করতে হলে চাই আরও সমন্বিত পদক্ষেপ, দেশীয় টিকা উৎপাদনের পুনঃচালু, পথ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সর্বস্তরে জনসচেতনতা। শুধুমাত্র দিবস উদযাপন নয়, এই রোগ নির্মূলে প্রত্যেকের অংশগ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি।