


ঘাড়ে ব্যাগ, গলায় ফিতা, বগলে সস্তা দামের একটি মাইক্রোফোন, হাতে ট্রাইপড, আর কোন রকম ভাঙাচোরা মোবাইল ফোন তাতেই হয়ে গেছেন গণমাধ্যম জগতের ‘সিনিয়র সাংবাদিক’। যেন মন চাইলেই খুব সহজেই সাংবাদিক হওয়া যায়! শার্ট-প্যান্ট ইন করে হাতে একটি মোবাইল নিলেই—“আমি সাংবাদিক”। বাস্তবতা এখন এমন এক বিব্রতকর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পবিত্র ও দায়িত্বশীল এই পেশাটি কিছু নামধারী ব্যক্তির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
জাতীয় প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি কিংবা বিভিন্ন জনসমাবেশ, যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই হাজির এই তথাকথিত সাংবাদিকরা। মাইক্রোফোন মানুষের মুখের সামনে ধরে, ভাঙাচোরা মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে, এরপর সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশের নামে দাবি করা হয় ‘চা-নাস্তার খরচ’। কেউ দিতে না চাইলে, তাকে একপ্রকার চাপ দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। যেন প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে চলছে চাঁদাবাজির এক নীরব মহোৎসব।
এমনই এক ব্যক্তির নাম মো. ইলিয়াস হোসেন। তিনি ‘জে জে টেলিভিশন’ ও ‘যুগ যুগান্তর পত্রিকা’র ঢাকা মহানগর প্রতিনিধি। শুধু এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও দাবি করেন, তিনি নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফুফাতো ভাই! অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। মাত্র দুই বছর আগেও তিনি শেয়ারবাজারে ব্যবসা করতেন, যেখানে টাকা লোকসান হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে তথাকথিত সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। তার নিজের ভাষায়—এই পেশা নাকি সবচেয়ে সহজ এবং আরামদায়ক; হাতে একটি মোবাইল থাকলেই নাকি ভালো আয় করা যায়।
মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়েই তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলে দাবি করেন। সাংবাদিকতায় তার অভিজ্ঞতা প্রায় দুই বছর হলেও, বয়স ৪৭ হওয়ায় নিজেকে ‘সিনিয়র’ বলতেও দ্বিধা নেই। কিন্তু এই সিনিয়রিটির আড়ালে যে কর্মকাণ্ড চলছে, তা শুধু অনৈতিকই নয়, পুরো পেশাটিকেই কলুষিত করছে।
মানুষের কাছ থেকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তার জবাব আরও বিস্ময়কর সংসার তো চালাতে হবে। অফিস থেকে আমাদের কোন বেতন দেওয়া হয় না। আমরা জোর করে নেই না, মানুষ খুশি হয়ে দেয়। এটা এক প্রকার সম্মানী।”
তিনি আরও দাবি করেন, তিনি একা নন, এমন আরও অনেকে আছেন। এমনকি তার কথায়, অফিসে টাকা না দিলে নাকি ভিডিও প্রকাশও করা হয় না, আর যা আয় হয় তার অর্ধেক দিতে হয় অফিসকে। কোনো নির্দিষ্ট বেতন না থাকায়, এই আয়ই তার একমাত্র উপার্জন।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে ‘জে জে টেলিভিশন’ ফেসবুক পেইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ‘যুগ যুগান্তর’ অনলাইন পোর্টালের সম্পাদকের কাছে জানতে চাইলে তারা সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় তারা অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করেন। তাদের এমন আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গণমাধ্যমের ন্যূনতম নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতার প্রতিও তাদের কোনো সম্মান নেই, যা একজন সম্পাদক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে কখনোই প্রত্যাশিত নয়।
গণমাধ্যম যেখানে সত্য তুলে ধরার এক মহৎ মাধ্যম, সেখানে এমন কিছু অসাধু মানুষের কারণে পুরো পেশাটিই আজ প্রশ্নের মুখে। লজ্জা-শরম ও আত্মমর্যাদাবোধকে উপেক্ষা করে তারা ব্যবহার করছে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে।
ঘটনাটি ঘটে পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনের সামনে হাজারো মানুষের সমাগমে নেতা-কর্মীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর চাঁদা দাবি করার সময় কয়েকজন প্রকৃত সাংবাদিক তার ভিডিও ধারণ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, কেন সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হচ্ছে? প্রশ্নের মুখে পড়েই তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন—যেন চোর ধরা পড়েছে! যদিও নিজের মুখেই স্বীকার করেন, তিনি ‘চা খাওয়ার জন্য’ টাকা নিয়েছেন এবং তা নাকি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে সরে পড়েন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীতে নিজের অফিসের ফেসবুক লাইভে এসে, যারা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন সেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই উল্টো অপপ্রচার শুরু করেন। তাদের ‘ইউটিউবার’ বা ‘ফেসবুকার’ বলে কটাক্ষ করেন, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলাও করেন। দৈনিক দেশের পত্রের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তাহসিন খন্দকারকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে দেখা যায়।
এই ধরনের ভুয়া ও চাঁদাবাজ সাংবাদিকতা যদি বন্ধ না হয়, তাহলে খুব শিগগিরই সাধারণ মানুষের আস্থা পুরো গণমাধ্যমের ওপর থেকে উঠে যাবে। তাই এখনই সময়, আইনের আওতায় এনে এসব অসাধু ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে, যাতে এই মহান পেশার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
গণমাধ্যম কোনো ব্যবসার মাধ্যম নয়, এটি মানুষের কণ্ঠস্বর, সত্য প্রকাশের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। আর সেই প্ল্যাটফর্ম যেন কিছু অসাধু মানুষের কারণে কলুষিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।