Date: February 01, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / খুলনা / ‘তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে তারুণ্যশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান’ - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্যাণে সত্যের প্রকাশ

‘তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে তারুণ্যশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান’

November 30, 2025 09:46:39 PM   স্টাফ রিপোর্টার
‘তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে তারুণ্যশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান’

বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো ‘সাগর মুন্সি স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৫’-এর ফাইনাল ম্যাচ। রবিবার বিকাল ৩টায় কুষ্টিয়ার এমএইচপি ব্রিক ফিল্ড মাঠে পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এই মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।

খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। এসময় আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনে তারুণ্যশক্তিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক কমিটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান মজনু।

ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয় শক্তিশালী দুই দল নওদাপাড়ার ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাব’ এবং খাদিমপুরের ‘সুমিরুল স্পোর্টিং ক্লাব’। রেফারির বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে খেলা।

WhatsApp Image 2025-11-30 at 5.56.23 PM (1)
খেলার প্রথমার্ধে আধিপত্য বিস্তার করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাব। দলের পক্ষে চমৎকার এক গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ফরোয়ার্ড তুর্জ। তবে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি সুমিরুল স্পোর্টিং ক্লাব। দ্বিতীয়ার্ধে তারা খেলায় ফিরে আসার জোর প্রচেষ্টা চালায় এবং দলের খেলোয়াড় আসাদ গোল করে দলকে সমতায় (১-১) ফেরান। নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় খেলা অমীমাংসিত থাকে এবং ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় টাইব্রেকারে।

টাইব্রেকারে নিজেদের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাব। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাব ৪টি গোল করতে সক্ষম হয়, যেখানে সুমিরুল স্পোর্টিং ক্লাব করতে পারে মাত্র ২টি গোল। ফলে ৪-২ গোলের ব্যবধানে শিরোপা নিশ্চিত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাব।

পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে এবং ফাইনালে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ব্যক্তিগত পুরস্কারও দেওয়া হয়। ফাইনালে দুর্দান্ত সেভ করে দলকে জেতানোয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু দাউদ স্পোর্টিং ক্লাবের গোলরক্ষক আব্দুর রাজ্জাক ‘ম্যাচ সেরা’ (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) নির্বাচিত হন। এছাড়া পুরো আসরে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের জন্য একই দলের খেলোয়াড় কিরণ ‘টুর্নামেন্ট সেরা’ (ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট) নির্বাচিত হয়েছেন।

খেলা শেষে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্ব। পরে মাটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর আয়োজনে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এতে জাগরণী সংগীত ও হামদ-নাত পরিবেশন করেন মাটির নিয়মিত শিল্পী শাহিন আলম, পাগড়ি সাকিব এবং কুষ্টিয়ার স্থানীয় বাউল শিল্পীরা।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম খেলাধুলার গুরুত্ব, যুবসমাজের অবক্ষয় রোধ এবং রাষ্ট্র গঠনে তরুণদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ও দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, “আমরা সারা বাংলাদেশে ফুটবল, কাবাডিসহ নানা ধরনের খেলার আয়োজন করে যাচ্ছি। এর মূল লক্ষ্য কেবল বিনোদন নয়। তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে এবং একটি সুস্থ-সবল জাতি গঠনে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। আজ তরুণরা মাঠবিমুখ হয়ে চার দেয়ালের ভেতর মোবাইল স্ক্রিনে বন্দি হয়ে পড়েছে। ভিডিও গেমস, লুডু বা দাবা খেলার মতো বিষয়গুলো মানুষকে অলস ও অন্তর্মুখী করে তোলে, যা ইসলামের চেতনার পরিপন্থী। আমরা চাই তরুণরা মাঠে ফিরে আসুক, তাদের শরীরের ঘাম ঝরুক। কারণ, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।”

রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তরুণদের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “খেলাধুলা ও শরীরচর্চার মাধ্যমে অর্জিত শক্তিকে একটি মহৎ কাজে লাগাতে হবে। আর সেই মহৎ কাজটি হলো-সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা। আজ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষের তৈরি কোনো ব্যবস্থাই শান্তি দিতে পারেনি। মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি হলো আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বা তওহীদ। এই তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্যই তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। তারুণ্যশক্তিকে আজ তওহীদভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম করা। হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ দুর্বল মোমেনের চেয়ে সবল ও কর্মঠ মোমেনকে বেশি পছন্দ করেন। তাই আল্লাহর রসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা কুস্তি, ঘোড়দৌড়, তীর নিক্ষেপসহ তৎকালীন রণকৌশলগত খেলাধুলার চর্চা করতেন। উদ্দেশ্য ছিল, যেন যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে উম্মাহ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সিনা টান করে দাঁড়াতে পারে।”

সমসাময়িক রাজনীতির সমালোচনা করে ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “এদেশে যুগ যুগ ধরে তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে ধাপ্পাবাজির রাজনীতি চলে আসছে। সাধারণ মানুষ একটি প্রতারক রাজনৈতিক চক্রের হাতে জিম্মি। যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই জনগণের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেছে। বর্তমান দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ আল্লাহর বিধান চায় কি না- সেই প্রশ্নে এখন গণভোটের আয়োজন করতে হবে। মানুষের সামনে বিকল্প জীবনব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেওয়া এদেশের মুসলিমদের মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার আদায়ে যুবসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।”

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বক্তব্যে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “ইসলাম কখনোই সুস্থ সংস্কৃতি বা গান-বাজনার বিরোধী নয়। কোরআনে গান হারাম বা হালাল -এমন কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সময়েও আনন্দ-উৎসবে গান-বাজনার প্রচলন ছিল। আম্মাজান আয়েশা (রা.) গান শুনেছেন এবং রাসুল (সা.) তাঁকে গান শুনিয়েছেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর বা বিয়ের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করা হতো। তবে রাসুল (সা.) গান থেকে অশ্লীলতা এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে বাদ দিয়েছিলেন।”

তিনি বলেন, “গান কখনো হারাম হতে পারে না, যদি তা অশ্লীলতা বা অসার কথাবার্তা মুক্ত হয়। আমরা গানের বিপক্ষে নই, বরং আমরা গানের পক্ষে। আমাদেরও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, আমরাও শতাধিক গান তৈরি করেছি। কিন্তু আমাদের গানগুলো শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এগুলো মানবতার কথা বলে, ঐক্যের কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলে।”

বর্তমানে সংস্কৃতির নামে চলে আসা বিভ্রান্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে অনেক শিল্পী আছেন যারা গান নিয়েই সারা জীবন কাটিয়ে দেন। কিন্তু একজন মুসলমানের জীবনের উদ্দেশ্য কেবল গান গাওয়া বা শোনা হতে পারে না। এটি উম্মতে মোহাম্মদীর চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আপনি গান গাইবেন, অবশ্যই গাইবেন- কিন্তু সেই গান হতে হবে মানবতার মুক্তির জন্য, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। সেই গান যেন মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদে উদ্দীপ্ত করে এবং আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা জোগায়।”

তিনি আরও বলেন, “গান গাওয়ার সময় অবশ্যই ভারসাম্যপূর্ণ ও শালীন শব্দচয়ন করতে হবে। এমন কোনো গান গাওয়া বা শোনা উচিত নয়, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর শানে বেয়াদবি হয় কিংবা যা মানুষকে অনৈতিকতার দিকে ধাবিত করে। আমরা চাই এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে, যা মানুষকে আত্মিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করবে এবং একটি সত্যনিষ্ঠ সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।”

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে খেলা আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি হেযবুত তওহীদের এমামের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন আয়োজক কমিটির সদস্যবৃন্দ। পরে প্রধান অতিথি মাননীয় ইমামের হাত থেকে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন আয়োজক কমিটির সদস্য ও অতিথিবৃন্দ। সম্মাননা প্রাপ্তরা হলেন- আয়োজক কমিটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান মজনু, পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. রিয়াল তালুকদার, যার নেতৃত্বে এই খেলার সফল আয়োজন সম্পন্ন হয় খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া সম্পাদক হৃদয় শেখ, আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক হৃদয় আহমেদ জয় ও টুর্নামেন্টের ধারাভাষ্যকার জিয়াউর রহমান।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- হেযবুত তওহীদের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিভাগের আমির ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নারী বিভাগের সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা বিভাগের আমির তানভীর আহমেদ, কুষ্টিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক আমির মো. জসেব উদ্দীন, শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মিঠু, কুষ্টিয়া জেলা হেযবুত তওহীদের সভাপতি মো. আক্কাস আলী প্রমুখ।

পরিশেষে চ্যাম্পিয়ন ও রানার-আপ দলের অধিনায়কদের হাতে ট্রফি ও প্রাইজমানি তুলে দেওয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, ফাইনাল খেলাটি ‘পিনাকল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যা দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শক উপভোগ করেন।