Date: April 21, 2026

দৈনিক দেশেরপত্র

collapse
...
Home / সারাদেশ / চট্টগ্রাম / অরাজকতাকে ‘জিহাদ’ আখ্যা: হাতিয়ায় উগ্রগোষ্ঠীর হুমকিতে স্থগিত হেযবুত তওহীদের ইফতার মাহফিল - দৈনিক দেশেরপত্র - মানবতার কল্য...

অরাজকতাকে ‘জিহাদ’ আখ্যা: হাতিয়ায় উগ্রগোষ্ঠীর হুমকিতে স্থগিত হেযবুত তওহীদের ইফতার মাহফিল

March 07, 2026 07:34:24 PM   জেলা প্রতিনিধি
অরাজকতাকে ‘জিহাদ’ আখ্যা: হাতিয়ায় উগ্রগোষ্ঠীর হুমকিতে স্থগিত হেযবুত তওহীদের ইফতার মাহফিল

নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর হাতিয়ায় স্থানীয় উগ্রবাদী ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হুমকি, উস্কানি ও বাধার মুখে প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনুরোধে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠান স্থগিত করেছে হেযবুত তওহীদ। সোমবার (৭ মার্চ ২০২৬) উপজেলার জাহাজমারা এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। প্রশাসনের অনুমতি সত্ত্বেও একটি উগ্রবাদী মহলের ‘মব’ তৈরির অপচেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় প্রশাসনের অনুরোধে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এতে প্রস্তুত করা প্রায় ৭০০ মানুষের বিরিয়ানি ও ইফতার সামগ্রী নষ্ট হয় এবং চরম বিড়ম্বনায় পড়েন আমন্ত্রিত অতিথিরা।

সরেজমিনে ও আয়োজক সূত্রে জানা যায়, হেযবুত তওহীদের হাতিয়া শাখার আমির ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হাজী বেলাল জাহাজমারায় তার নিজ বাড়ির আঙিনায় এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। গত ১০ দিন ধরে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। এটি ছিল মূলত একটি ঘরোয়া ও সামাজিক আয়োজন, যেখানে হাজী বেলাল তার আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, বন্ধু-বান্ধব, স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষী ও হেযবুত তওহীদের স্থানীয় সদস্যদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। প্রায় ৭০০ মানুষের জন্য প্যান্ডেল, চেয়ার-টেবিল ও খাবার রান্নাসহ সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। স্থানীয় থানা প্রশাসন এবং ফাঁড়ির আইসি-সহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল এবং তারা অনুষ্ঠানে আসার সম্মতি জানিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শান্তিপূর্ণ এই আয়োজনকে ঘিরে জোহরের নামাজের পর থেকেই গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে স্থানীয় ‘জাহাজমারা ইমাম খতিব ওলামা পরিষদ’, ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে কিছু উগ্রবাদী। জাহাজমারা মারকাজুল উলুম কওমি মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা মুফতি ফয়জুল্লাহ কাসেমীর নেতৃত্বে উগ্রগোষ্ঠীটি মিথ্যা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। এ সময় আরও উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন জাহাজমারা ইমাম খতিব ওলামা পরিষদের সহ-সেক্রেটারি মাওলানা নবীর উদ্দিন, সেক্রেটারি হাফেজ মাওলানা রাকিবুল ইসলাম, জামায়াতের জাহাজমারা ইউনিয়নের আমির মাওলানা মাহবুবুর রহমান, হেফাজতে ইসলাম জাহাজমারা ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, বাজার কমিটির সভাপতি নবীর উদ্দিন।

অভিযোগ রয়েছে, জাহাজমারা বাজারের ৩-৪টি মসজিদ থেকে মাইকিং করে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে জঘন্য মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালানো হয়। তারা বেনামী মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে ভরা হ্যান্ডবিলের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা মানুষকে উসকানি দিতে থাকে। তারা ‘হেযবুত তওহীদের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’ এমন সহিংস স্লোগান দিতে দিতে হাজী বেলালের বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। ১৭ রমজান বা বদর দিবসের দোহাই দিয়ে এই অরাজকতাকে ‘জিহাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেয়, অবিলম্বে ইফতার মাহফিল ও প্যান্ডেল ভেঙে না দিলে তৌহিদী জনতা নিজেরাই তা গুঁড়িয়ে দেবে।

এদিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়। শুরুতে পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উত্তেজিত জনতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং আয়োজকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু উগ্রবাদীরা সংঘবদ্ধভাবে ‘মব’ সৃষ্টি করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে জাহাজমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ খোরশেদ আলমসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আয়োজকদের সাথে কথা বলেন। তিনি ঘোলাটে পরিস্থিতি বিবেচনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা প্রাণহানি এড়াতে প্রোগ্রামটি স্থগিত করার অনুরোধ জানান। প্রশাসনের অনুরোধে এবং রক্তপাত এড়াতে হেযবুত তওহীদ তাৎক্ষণিকভাবে প্রোগ্রাম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।

ইফতার মাহফিলের আয়োজক হাজী বেলাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আমাদের আত্মীয়-স্বজন ও মেহমানদের নিয়ে ইফতার করার জন্য সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিলাম। প্রায় ৭০০ মানুষের জন্য বিরিয়ানি রান্না করা হয়েছিল, ডেকোরেশন করা হয়েছিল। কিন্তু উগ্রবাদীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে আমাদের এই ধর্মীয় কাজে বাধা দিল। তারা আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে, তা সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট।”

এ বিষয়ে হেযবুত তওহীদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় আমির মাহবুব আলম তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “স্বাধীন দেশে নিজের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার অধিকার হরণ করা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতেই একটি বিশেষ মহল পবিত্র রমজান মাসে এমন উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।”

তিনি আরও বলেন, “হেযবুত তওহীদ আইনের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল বলেই প্রশাসনের কথায় সরে এসেছে। কিন্তু পুলিশি ঘোষণা ও আমাদের সরে যাওয়ার পরেও উগ্রবাদীরা সেখানে দীর্ঘসময় অবস্থান করে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করেছে, যা প্রমাণ করে তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধুই অরাজকতা সৃষ্টি করা।” তিনি এই উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং নিরপরাধ হেযবুত তওহীদ সদস্যদের এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

এ বিষয়ে জাহাজমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ খোরশেদ আলম বলেন, “ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা সাময়িকভাবে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার অনুরোধ করি। আয়োজকরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তা মেনে নিয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”